করোনাকাল
বিচ্ছিন্ন অনুভব
মাহফুজা হিলালী

প্রবন্ধ
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান
শামসুজ্জামান খান

গল্প
ডায়মন্ড লেডি ও পাথর মানব
হামিদ কায়সার

গদ্য
নিদ্রা হরণ করেছিল যে বই
মিনার মনসুর

নিবন্ধ
পঞ্চকবির আসর
সায়কা শর্মিন

বিশ্বসাহিত্য
আইজাক আসিমভের সায়েন্স ফিকশন
অনুবাদ: সোহরাব সুমন

বিশেষ রচনা
প্রথম মহাকাব্যনায়ক গিলগামেশ
কামাল রাহমান

শ্রদ্ধাঞ্জলি
মুজিব জন্মশতবর্ষ
মারুফ রায়হান
 
সাক্ষাৎকার
কথাশিল্পী শওকত আলী

জীবনকথা
রাকীব হাসান

ভ্রমণ
ইম্ফলের দিনরাত্রি
হামিদ কায়সার

ইশতিয়াক আলম
শার্লক হোমস মিউজিয়াম

নিউইর্কের দিনলিপি
আহমাদ মাযহার

শিল্পকলা
রঙের সংগীত, মোমোর মাতিস
ইফতেখারুল ইসলাম

বইমেলার কড়চা
কামরুল হাসান

নাজিম হিকমাতের কবিতা
ভাবানুবাদ: খন্দকার ওমর আনোয়ার

উপন্যাস
আলথুসার
মাসরুর আরেফিন

এবং
কবিতা: করেনাদিনের চরণ

১৪ বর্ষ ১১ সংখ্যা
জুন ২০২২

লেখক-সংবাদ :





দমবন্ধ প্রহরে
কল্যাণী রমা
‘লক্ষ মানুষ ভাত চেয়ে মরে
লক্ষ মানুষ শোকে ভেসে যায়
ঘরহীন ভাসে শত শত লোক
লক্ষ জননী পাগলের প্রায়।
রিফিউজি ঘরে খিদে পাওয়া শিশু
পেটগুলো সব ফুলে ফেঁপে ওঠে
এইটুকু শিশু, এতবড় চোখ
দিশেহারা মা কার কাছে ছোটে।

ঘরহীন ওরা ঘুম নেই চোখে
যুদ্ধে ছিন্ন ঘর-বাড়ী-দেশ
মাথার ভিতর বোমারু বিমান
এই কালো রাত কবে হবে শেষ।
শত শত মুখ হায় একাত্তুর
যশোর রোড যে কত কথা বলে
এত মরা মুখ আধ মরা পায়ে
পূর্ব বাংলা কোলকাতা চলে।’

আমরাও চলেছি। মা এক শাড়িতে, বাবা লুঙ্গি পরে, আমি বাবার ঘাড়ে পা ঝুলিয়ে, শ্যামা মার্ কোলে। এক কাপড়ে বেরিয়ে পড়েছি আমরা। মা'র পেটিকোটে বিয়ের গয়না বাঁধা। বড় সুন্দর সে গয়না। ঝলমল ক'রে। দাদুভাই সোনার বার কিনে তা দিয়ে বড় মেয়ের গয়না গড়িয়েছিল।
আমাদের আর ঘর নেই। আমরা বাচঁতে চাই। পাকিস্তানিরা ছুটে আসছে পিছনে। গ্রামে কিছু ঘরে আমাদের আশ্রয় দিল। অজানা মানুষের ভালোবাসা আমাদের বাঁচিয়ে রাখল । মাও শ্যামাকে বাঁচিয়ে রাখতে গুঁড়া দুধে জল মিশিয়ে মিশিয়ে খাইয়ে গেল । ওর চেহারা হয়েছে বায়েফ্রার বাচ্চাদের মত। বড় বড় চোখ, বিরাট মাথা, হাত পা কাঠি কাঠি। আরো পথ যেতে হ'বে।
গ্রামের মানুষ বেত কাঁটা ছড়িয়ে রেখেছে ফসলের মাঠে। কি করবে তা না হ'লে? লক্ষ লক্ষ মানুষ ফসলের মাঠ মাড়িয়ে, মৃত্যু মাড়িয়ে ভারতে চলেছে।
নিজ দেশ আর ভারতের বিভিন্ন গ্রামে নানা অজানা, অচেনা বাড়িতে থেকে অবশেষে আমরা গিয়ে পৌঁছালাম জলপাইগুঁড়ির মালবাজারে।। মার পিসির বাড়ি। দাদুভাই-এর একমাত্র বোন। বড় আদরের ছোটবোন। আমাদের চারজনকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন দিদা। দাদু, দিদা, সাধনা মাসি, কল্যাণী মাসি, ভবানী মাসি, শিবানী মাসি, শংকর মামা আমাদের জন্য কি করবে ভেবে পায় না। পাঁচ মাস কাটিয়ে দিলাম ওনাদের বাড়িতে আমরা। আমাদের কিছু নেই। আমাদের গায়ের জামা বাদে অন্য জামা-কাপড় নেই। পয়সা নেই। দাদু দিদা সবকিছুর ভার নিলেন। এইসব মানুষের ঋণ কিভাবে শোধ ক'রা যায়? মৃত্যু থেকে বাঁচিয়ে যারা আশ্ৰয় দেয়? সব দায়িত্ব নেয়? আমাদের জন্য ওদের ঘরে কিংবা মনে জায়গার অভাব হয়নি।
যুদ্ধর বোমারু বিমানের কথা মনে পড়ছে, মৃত্যুর কথা মনে পড়ছে, দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার কথা মনে পড়ছে, ব্ল্যাক-আউট -এর কথা মনে পড়ছে। সেই সাথে আমার একটা শ্রাদ্ধ বাড়ির কথাও বড় মনে পড়ছে । বহুদিন কোন উত্সবে যাইনি। ভবানী মাসিদের প্রতিবেশীর বাড়িতে শ্রাদ্ধ। আমার তো উৎসব বলে মনে হ'ল। চার বছর বয়সের যে জীবনে যুদ্ধ দাগ কেটে যায় সেখানে খাওয়া দাওয়া মানেই উৎসব, তা সে শ্রাদ্ধের খাওয়াই হোক বা না কেন। কলাপাতা পেতে খেতে বসেছি। শেষপাতে রসগোল্লা দিয়েছে। সাথে দই।
শ্যামাটা এত আস্তে খায়। কিছুই খেয়ে উঠতে পারে না। মা তাড়া দিয়ে যাচ্ছে। ‘তাড়াতাড়ি মাছটা খাও’। এক বয়স্ক মহিলা বললেন, 'বাচ্চা মানুষ, যতটুকু পেটে ধরে, ততটুকুই তো খাবে।' অপমানে মা'র ফর্সা মুখ লাল হ'য়ে উঠল।
'৭১ এর এই ঘটনাটার কথা যখনই ভাবি মা'কে আমার "সর্বজয়া" ব'লে মনে হ'য়।