করোনাকাল
বিচ্ছিন্ন অনুভব
মাহফুজা হিলালী

প্রবন্ধ
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান
শামসুজ্জামান খান

গল্প
ডায়মন্ড লেডি ও পাথর মানব
হামিদ কায়সার

গদ্য
নিদ্রা হরণ করেছিল যে বই
মিনার মনসুর

নিবন্ধ
পঞ্চকবির আসর
সায়কা শর্মিন

বিশ্বসাহিত্য
আইজাক আসিমভের সায়েন্স ফিকশন
অনুবাদ: সোহরাব সুমন

বিশেষ রচনা
প্রথম মহাকাব্যনায়ক গিলগামেশ
কামাল রাহমান

শ্রদ্ধাঞ্জলি
মুজিব জন্মশতবর্ষ
মারুফ রায়হান
 
সাক্ষাৎকার
কথাশিল্পী শওকত আলী

জীবনকথা
রাকীব হাসান

ভ্রমণ
ইম্ফলের দিনরাত্রি
হামিদ কায়সার

ইশতিয়াক আলম
শার্লক হোমস মিউজিয়াম

নিউইর্কের দিনলিপি
আহমাদ মাযহার

শিল্পকলা
রঙের সংগীত, মোমোর মাতিস
ইফতেখারুল ইসলাম

বইমেলার কড়চা
কামরুল হাসান

নাজিম হিকমাতের কবিতা
ভাবানুবাদ: খন্দকার ওমর আনোয়ার

উপন্যাস
আলথুসার
মাসরুর আরেফিন

এবং
কবিতা: করেনাদিনের চরণ

১৪ বর্ষ সংখ্যা ৩
অক্টোবর ২০২১

লেখক-সংবাদ :





স্বপ্নবৎ
নাহার মনিকা
পাখা গজানোর বিষয়টা এযাবৎ কাউকে বলেনি সোনাভান বিবি। কিন্তু এখন আর চেপে রাখা যাচ্ছে না। আজকাল ঘুম ভাঙতেও দেরি হয়ে যাচ্ছে। সকালবেলা ঘরের কপাট খোলার আগে ভালো করে নিজেকে দেখে ঢেকে নিতে হয়। দুই কাঁধের নিচে পিঠের ওপর কিছুদিন আগের ফোঁড়ার মতো উঁচু মাংসপিণ্ড এখন সামান্য শক্ত, শুরুর দিকে ব্যথাটুকুও আর নেই। কয়েক দিন আগেও  পিঠের দিকে হাত দিলে শুধু রোমশ ঠেকেছে, কিন্তু আজকাল সেখানে পেলব পালকের আভাস।
দিনের মধ্যে কতবার যে হাত দিয়ে দেখতে ইচ্ছে করে! কিন্তু লোকজনের সামনে কি তা সম্ভব!  রাত হলে ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে কৌতূহলি চোখ এড়ানো যায়। বাকি সারা দিন নিশ্বাসের মতো পাখনার জেগে যাওয়া তার সংবিত দখল করে রাখে।
সুখের কথা যে এখন তার নিজস্ব পাকা ঘর। আগের মতো বেড়ার ফাঁক দিয়ে কৌতূহলী চোখ আর প্রশ্নের সম্ভাবনা নেই। ৬০ পাওয়ারের বাল্বের আলোয় আয়নায় নিজেকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখা যায়। তারপরও গভীর রাতে আলো জ্বলতে দেখলে মোতাহার বা তার বউ দু-একবার দরজা ধাক্কা দিয়েছে- ‘চাচি, রাইত দুইফর, অহনো ঘুম যান নাই! শইল ঠিক আছে?’
শরীরের কথা ভাবার অবকাশ সোনাভান কখনো পেয়েছে? ঝড়, বৃষ্টি, খরা, আকালে, অভাবে, নিজের শরীরের কথা তো ভুলেই থাকত সে। মনটাকে সুচের আগায় গেঁথে পেছনে শরীরটাকে সুতোর মতো টেনে নিয়ে গেছে এতকাল। এই করে করে তার গায়ের রঙ পুড়ে গাছের মরা বাকলের মতো হয়েছে, হাতের কবজি যেন বাঁশের কঞ্চি, পেট পিঠের সঙ্গে লেপ্টে গেছে, আর উচ্চতা কমে গিয়ে সোনাভানকে নজরে পড়ে না যতক্ষণ না সে কথা বলে ওঠে। তবে জ্যান্ত আছে তার চোখ। ধ্যানরত এক ঠ্যাং বক হঠাৎ মাছের নড়াচড়ায় যেমন সচল হয়ে যায়, সোনাভানও তেমন ডাক পড়লে ঝিম মারা শরীরে ঝাঁকি দিয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে। সে সক্রিয় হয়ে ওঠার মধ্যে তার ব্যক্তিত্ব প্রকাশ পায়, যার সামনে তার আশপাশের মানুষগুলো বিনীত হয়, সমীহ করে। দুঃখকষ্টের দিন পার হয়ে এসব নিজের প্রাপ্য বলে মনে হয় সোনাভানের।
আজকাল সমীহ করা লোকজনের সামনে পিঠের ওপর পাখনা দুটোর তির তির কাঁপন টের পায় সোনাভান। যখন অসুখে পড়া হাঁস-মুরগি নিয়ে ঘরের সামনে চিকিৎসাপ্রত্যাশী মানুষেরা লাইন দেয়, রাতে টাকা গুনতে বসলে, কিংবা মোতাহারকে হাজার দশেক টাকা কর্জ দিতে পারলে সোনাভান তার পাখনার আন্দোলিত হওয়া টের পায়। এখন এসবের সঙ্গে সঙ্গে বিশেষ দাওয়াতের দিনগুলিতেও সোনাভান প্রায় ওড়ে ওড়ে করে।  
আজকে যেমন, বটপাড়ার মজিদ আলীর বউয়ের সামনে পিঁড়িতে বসে থাকা কঠিন হয়েছিল।   

সৈয়দবাড়ির খবরটা দিতে মোতাহার যখন এল তখন বেলা ভালোই। ঘিয়ে রঙের রোদ আতরের মতো ভুর ভুর করে উঠানজুড়ে ছড়িয়ে গেছে।  কটা বাজে দেখতে হলে ঘরে ঢুকে টেবিলের ওপর রাখা মোবাইল ফোন দেখতে হয়। কিন্তু গায়ে চাদর জড়ানো সোনাভানের হাত আটকা। কোলের কাছে ধরা বেমারী মুরগি কক কক করছে, সেটার ধারালো ঠোঁট আলগা করে হাঁ করিয়ে ওষুধ ঢেলে দিতে হবে, রেনামাইসিন ট্যাবলেট পানির সঙ্গে মিশিয়ে এখন খাইয়ে দিয়ে আবার সন্ধ্যার আগে আরেকবার।  মজিদ আলীর বউ মুরগিটার পায়ে বাঁধা দড়ি হাতের কবজিতে পেঁচিয়ে বেজার মুখে সামনে দাঁড়িয়ে আছে, মুরগি ছটফট করলেই দড়ি ধরে টান দিচ্ছে। এমন সময় এঁকেবেঁকে সামনে এসে মোতাহার তাকে খবর দিল যে সৈয়দা মনোয়ারা বেগমের জানাজার সময় বাড়ির মহিলাদের নিয়ে দোয়া-দরুদ পড়তে সোনাভানকে যেতে হবে।
উঠানের কাঁঠালগাছের ছায়া গাছের গোড়ায় থেবড়ে থেবড়ে আছে। সোনাভান আড়চোখে সেদিকে একবার দেখে নেয়। ভেতরে উৎসাহ জেগে উঠলেও তার চোখ মুরগির ঠোঁট ফাঁক করার দিকে স্থির, বেমার মুরগি সুস্থ হওয়াও কম জরুরি না। নিচের ঠোঁট দাঁতে চেপে, আঙুলের ব্যথা পাত্তা না দিয়ে শক্ত হাতে পাখসাট আর গ গ আর্তনাদ উপেক্ষা করে সামান্য তরল ঢেলে দিয়ে মুরগিটাকে ছেড়ে দেয় সোনাভান বিবি। তারপর ডান হাত হাঁটু বরাবর সোজা করে রেখে পিঁড়ির ওপর বসতে গিয়েও নিজেকে দারুণ পলকা ঠেকে। পিঁড়ি থেকে নিজের শরীরটা কি অল্প উঠে গেল? সোনাভান কি উড়তে শিখে যাচ্ছে? এই অভাবনীয় ঘটনাটা মোতাহারের, কিংবা পোল্ট্রির অসুখ নিয়ে আসা যেনতেন মানুষজনের সামনে ঘটুক, তা কি সম্ভব! এ ঘটনা দেখা বা দেখানোর জন্য বিশেষ মানুষ চাই। তারা কে বা কারা, জানে না সোনাভান।
এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল মোতাহার। সম্পর্কে ভাশুরের ছেলে। সেও এবার হাঁটু ভেঙে বসে পড়ে আরো একবার খবরটা দেয়। যেহেতু জাহেরা বেওয়া অনুপস্থিত, সোনাভানের এ সুযোগ হারানো উচিত হবে না।
সৈয়দবাড়ির মনোয়ারা বেগম ইন্তেকাল করেছেন। সোনাভান জানে যে ওই বাড়ির লোকজন ইন্তেকাল ফরমায়। আর তারা, তার করিমুন্নেসা মরে যায়। সৈয়দবাড়ির ফরসা মানুষজন বড় বড় গাড়ি ভর্তি করে না গত সন্ধ্যায় এসে পৌঁছেছে। উঠানের রোদ তেতে উঠছে। পিঁড়িতে বসে সোনাভান চাদরের নিচে পাখনা দুটোর নড়াচড়া অনুভব করে।
হ্যাঁ, সে নিশ্চয়ই যাবে। জাহেরা বেওয়া থাকলে তো সে ই যেত। ঢাকায় ছেলের কাছে বেড়াতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে জবান বন্ধ। এত দিন ধরে সোনাভানকে শিষ্য হিসেবে কম তো শেখায়নি। সুরা, কেরাত, হাদিস নসিহতের পাশাপাশি জটিল পরিস্থিতি সামাল দেয়ার কায়দাকানুন সব তোতা পাখির মতো শিখিয়েছে। হাঁস-মুরগির চিকিৎসার প্রশিক্ষণের পর থেকে সোনাভানের সাহস বেড়েছে, নতুন কিছু শিখতে উৎসাহের কমতি হয় না। আর এ তো ধর্মকর্মের বিষয়। জাহেরা আপার ওয়াজ-মছলা মুখস্থ হতে সময় লাগেনি। তবে এমনি এমনি তাকে দায়িত্ব দেয়নি, নিজে সামনে থেকে কয়েকবার সোনাভানকে দিয়ে কথা বলিয়েছে। সেসব মনে মনে আওড়ায় সে। যাওয়াই নিয়তি, যাওয়াই ভবিতব্য। এ রকম যাওয়া তার নিজের গন্তব্যও নির্ধারণ করে।  
কিন্তু চুলে পাক ধরে যাওয়া সোনাভান বিবির জীবনেও যে পাখা গজানোর মতো অত্যাশ্চর্য খটকা দেখা দিতে পারে, কে জানত! নিজের এই যে একটা খটকার মধ্যে আটকে থাকা অবস্থা কাকে, কীভাবে বলবে সে? নিজের কথা, অন্তত এই কথা বলার মতো এই নিখিল বিশ্বে তার কেউ নেই। নিখিল বিশ্ব কথাটা জাহেরা বুবুর  খুব পছন্দ। প্রায়ই ব্যবহার করত। নিখিলের চির সুন্দর সৃষ্টি আমার মুহাম্মদ রাসুল- এই গজল করিমুন্নেসাও খুব সুন্দর করে গাইতে পারত। রিনরিনে মিষ্টি একটা গলা ছিল। ঢলঢলে ব্লাউজের হাতায় নতুন বরবটির মতো লকলকে শরীর ছিল মেয়েটার।
‘সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ, আশরাফুল মখলুকাত। আল্লাহ সুবানাল্লাহ তায়ালা মাটি দিয়ে অতি দরদসহকারে তাকে সৃষ্টি করেছেন। এই জন্য মানুষের সম্পর্ক মাটির সঙ্গে। তার দেহ মাটিতে মিশে যায়’...চোখ বন্ধ করে মনে মনে কথাগুলো ঝালিয়ে নেয় সোনাভান বিবি। হাতে মুরগির চুনা পায়খানা লেগে গেছে। অন্য সময় অত গায়ে লাগে না, কিন্তু এসব দাওয়াতে যাওয়ার আগে নিজেকে পাক সাফ করা লাগে।  গোসল করার কথা ভেবেও থেমে যায় সে। বরং ঘাটলায় নেমে ভালো করে হাত-মুখ ধুয়ে অজু করে আসবে একবারে।
উঠান বেশি বড় না, কোনার বরই গাছটার কারণে ছ্যাকড়া ছ্যাকড়া সূর্যের আলো। ভেজা কাঁথা রোদে দিয়েছে মোতাহারের বউ। ভালো করে ধোয়নি, মুতের গন্ধ ভেসে আসছে। কপাল কুচকে আসে সোনাভানের, সে কি এখন আর হেলাফেলা করার মানুষ? কড়া করে বলতে হবে। এ বাড়িতেই যদি সবকিছু পয়-পরিষ্কার না থাকে, তাহলে?
একটু ত্রস্ত পায়েই ঘাটলার দিকে হাঁটা দেয় সোনাভান। এখন কাজ হচ্ছে জাহেরা আপার শেখানো ওয়াজ কয়েকবার মনে মনে মকশো করা। কথাবার্তা সবই জানা কিন্তু এখনো তত ঘন ঘন ডাক পায় না সোনাভান। আর দু-একজন ত্যাদড় কিসিমের জোয়ান মেয়েটেয়ে কেউ উলটাপালটা প্রশ্ন করলে ভেতরে ভেতরে দমে যায় সে।
পুকুরপাড় ঘেঁষে জাংলায় আগবাড়িয়ে আসা শীমের ফুল থেকে মাথা নিচু করে ঘাটে নামে। এমনিতেই ছোটখাটো সে, আজকাল মনে হয় নিজের ওজন নিজের কাছে কমে যাচ্ছে। আচ্ছা, ওজন কমে যাওয়ার ঐটাও একটা কারণ কি? আস্তে আস্তে পলকা হবে শরীর। কিসের মতো? উড়তে পারার মতো? সত্যি সত্যি উড়তে পারার মতো! মাথার ভেতরে এ ভাবনার চাপ হঠাৎ করে বেড়ে যেন হাজার গুণ হয়ে যায়। দুই হাতে কপালের শিরা টিপে পুকুরপাড়ে বসে থাকে সে।   
কাউকে এ কথা বলা দরকার!
কার কাছে বলবে সে? আপন বলতে ছিল ছেলে। সে তো আর আপন নেই, বউয়ের সঙ্গে শ্বশুরবাড়ি বাড্ডায় গিয়ে উঠেছে। উঠুক, কিন্তু সোনাভানের সঙ্গে যোগাযোগ এক্কেবারে বন্ধ করে দেবে? আশ্চর্য হয় না সে। একই রক্তের তো। বাপের ধাত। করিমুন্নেসার জন্মের মাসখানেকের মধ্যে যে লোক বউ-ছেলেমেয়ে ছেড়ে সোনাভানের চাচাতো বোনকে নিয়ে পালিয়ে যায়, সে কি কোনো মানুষের জাতের মধ্যে পড়ে?
মেয়ে করিমন্নেসাকে বলতে পারত, বলার মতো ন্যাওটা ছিল সে মায়ের। পায়ে পায়ে ঘুরত। তখনো যুব মন্ত্রণালয়ে হাঁস-মুরগি চিকিৎসার স্বল্পকালীন ট্রেনিং পায়নি সোনাভান। সারা দিন পাটখড়িতে করিমন্নেসার টোকানো গোবরের সঙ্গে তুষ ছেনে মুঠ মুঠ করে গেঁথে ঘরের বেড়ায় খাড়া করে শুকিয়ে রাখত। উঠান ঝাড়ু দিয়ে পাতা জমা করে রান্না করত, বড় হাঁড়িতে জিইয়ে রাখা শিং মাছের ঘাইয়ে তার করিমন্নেসার আঙুল ফুলে গিয়েছিল একবার। তখনো সোনাভানের আজকের মতো দালানঘর, মোবাইল ফোন, তিন বেলা খাওয়ার উপায় ছিল না।
মেয়েটার টলটলে চোখে খুব বুদ্ধি ঠিকরে বের হতো। ছিটকাপড়ে ঝাড়ুর কাঠি দিয়ে পুতুল বানিয়ে খেলতে খেলতে দৌড়ে এসে বলত- ‘আম্মা, একটা কথা কারো কাছে বলবা না তো?’
সোনাভান কৌতূহলী হয়ে তাকালে বলত- ‘আমি একটু উইড়া দেখতে চাই। দুইডা পাখনা বানায়া দিবা?’, মুঠি থেকে ছিটকাপড়ের টুকরা বের করে দেখিয়ে বলত- ‘এই দেখ কাপড়ের কিনারে নাইরকেলের সলা লাগায়া, ঘুড্ডির মতন, আমার ডেনার উপরে বাইন্ধা দিবা, পারবা না আম্মা? ও আম্মা?’- কাছে দাঁড়িয়েও আকুল ডাক দিত যেন দূরে আছে।
শত দুঃখেও সুখের হাসি পেত সোনাভানের-‘ উইড়া কই যাইবা মা?’
-‘এই মনে কর দূরে...অনেক দূরে...’। করিমন্নেসার চোখের ওপরে ধীরগতিতে একটা স্বপ্নের পর্দা নেমে আসত। যেন নাম জানা না থাকলেও গন্তব্য জানা আছে। পরক্ষণেই ছটফট করে বলত- ‘আমি আমার পুতুলের বিয়া দিব না। দিলেও ঘরজামাই রাখব, ঠিক আছে?’
পুতুলের বিয়ে দেয়ার আগেই করিমন্নেসার বিয়ে দিয়েছিল সোনাভান। বারোর পরে তেরো বৎসর পার করে। তখন তার পোল্ট্রির বেরামের ট্রেনিং ছিল না। বেড়ার ঘরের বাঁশের খুঁটিতে ঘূণ ধরেছিল। ভাশুর জীবিত ছিল। এক সন্ধ্যায় হাট থেকে ফেরার সময় সঙ্গে করিমন্নেসার বিয়ের পাত্র নিয়ে এল। সোনাভানের নিজেরও তখন মনে হয়েছে- বিয়ে দেয়াই ভালো। পাখনা গজানোর আগে বিয়ে হোক।
বছর তিনেক সংসার করেছিল কচি মেয়েটা, তারপর বাচ্চা হতে গিয়ে একলামশিয়া হয়ে দুনিয়া ছেড়েই চলে গেল। বেঁচে থাকতে পুতুল খেলা ছেড়ে ছুটে আসার মতোই মায়ের বাড়ি ছুটে ছুটে আসত। ঘরে ঢুকে দিনের বেলায়ও খিল তুলে দিয়ে ফিস ফিস করে বলত- ‘আম্মা, একটা কথা শুন!’
আজকে মেয়েটা কাছে থাকলে সোনাভানও দরজায় খিল তুলে তাকে দেখাতে পারত! বলত- ‘করিমন দ্যাখ তো, আমার বগলের নিচে দিয়া পিডের দিকে কি হইছে? এইখানে ফইড় কইথথেইকা অইলো? দ্যাখ টান দিয়া ছিড়া ফালা তো মা। ফইড় টানলে ব্যাদনা পামু না। আর পারলে সবটা উঠায়া তর পিঠে লাগায়া দে।’
পুকুরঘাটের পানিতে সাবানের ফেনা, কেউ গোসল নয়তো কাপড় ধুয়ে গেছে। আবারো কপাল কুচকে আসে সোনাভান বিবির। কিন্তু এ সময়টায় শরিকের বাড়ির কলপাড়ে দু-তিন ঘরের বাসি থালাবাসন মাজার অপেক্ষায় জমে থাকে, আর বউ-ঝিরা যে কোথায় কোথায় যায়! থালাবাসন কুকুর-বিড়ালে চেটে যায়, ঘেন্না লাগে। তার কাজ হলো সারাক্ষণ পাক পবিত্র থাকা, তাকে তো এরা একটু সহযোগিতা করতে পারে! কিন্তু আজকে সোনাভানের কি হলো- ঘাটে বেড়া দেয়া থাকলেও এখন আর সেখানে গোসল করে না সোনাভান। টিউবওয়েলের কাছে গোসলখানা রেখে ভুল করে পুকুর ঘাটে এসে গেল কেন!  
এমন না যে এরা তাকে শ্রদ্ধাভক্তি কম করে, সত্যি কথা বললে তার কোনো অভিযোগ নেই। ওই তো মোতাহারের বউ যখন-তখন ঘরের দরজায় উঁকি দিয়ে বলে- ‘আনাজপাতি কুইট্টা দিবো চাচি আম্মা? রান্ধন চড়াইবেন?’ ওদের সামনেই কেন যেন তার পাখনা দুটো সজাগ হয়ে ওঠে। নিজের অজান্তেই মাটি থেকে শূন্যে উড়ে যেতে চায়।
 
     
টিউবওয়েল চেপে বালতি ভর্তি পানি টিনের বেড়া দেয়া গোসলখানায় নিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয় সোনাভান। ব্লাউজ খুলে প্রথমে দুই হাত দিয়ে পিঠের দুই পাশে হাতে দেখে, পাখনা দুটো সামান্য বড় হয়েছে মনে হচ্ছে। পালকেও পেলব ভাবটা কমে এসেছে। কি রঙের পালক? সোনাভান কাঁধ বাঁকিয়ে একটুখানি দেখতে পায়। ছাই রঙ। একটু মন খারাপ হয় তার। খুব আশা ছিল গাঢ় নীল রঙের পাখনার রং দেখবে। কি জানি, হয়তো ছাই রঙটা আস্তে আস্তে নীল বর্ণ ধারণ করবে। হাত দিয়ে একটু টেনে ভালো করে দেখার চেষ্টা করে সোনাভান। আরো বড় হতে হবে। ছোটবেলায় বোরাকের ছবি দেখেছে, ঘোড়ার শরীরে অপূর্ব সুন্দর নারীর মুখ, আর পিঠে দুই ডানা।
আল্লাহপাকের কারিশমার কি কোনো সীমানা আছে? হতেই তো পারে সোনাভানের ওপর বোরাক ভর করল। সাত আসমানের ওপরে উড়তে উড়তে করিমন্নেসার দেখা পেয়ে গেল সে!
একা গোসলখানায় কোনো অস্বস্তি থাকে না সোনাভানের। বরং পাখনা দুটোকে খুব আপন মনে হয়। আচ্ছা, পায়ের ভর ছেড়ে দিয়ে একটু চেষ্টা করে দেখবে নাকি? সত্যি যদি ওড়ার ক্ষমতা হয়, তাহলে প্রথমে সে যাবে মক্কা শরিফ, নবীজির রওজা মোবারক!
পানির ছিটা পেয়ে পাখনা দুটো ভেজা পাটের মতো নেতিয়ে পড়েছে। আনমনে গায়ে পানি ঢালে সোনাভান।
তার শরীরের ব্যথাবেদনাহীন এই তেলেসমাতির কথা জানাজানি হলে কি কাণ্ডটা হবে- ভেবে বেশ আমোদ লাগে সোনাভানের। এত দিনের এবাদত বন্দেগীর নেকি তাহলে দুনিয়ায় বসেও পাওয়া সম্ভব।
কলপাড়ে মোতাহারের বউয়ের গলা পাওয়া যায়- ‘ও চাচি গোসলখানায় ঘুমায় গেছেন’?
ধড়মড়িয়ে ওঠে সোনাভান। ঝটপট ঘাড় গলা মুছে, শুকনো শাড়িতে, গামছায় জড়িয়ে নিজেকে শান্ত করে দরজা খুলে বেরিয়ে আসে।
মোতাহারের বউয়ের চোখে কি কোনো অবাক দৃষ্টি! সোনাভান তার চোখে চোখ ফেলতে চায় না।
তার ‘শরীল খারাপ লাগতাছে চাচি আম্মা?’ প্রশ্নের জবাবে  না সূচক মাথা নেড়ে ঘরের দিকে এগিয়ে যায়।
 ‘কায়া পড়ে থাকে। মানুষ তার মাবুদের কাছে হাজিরা দেয়।  মাবুদ তার বান্দাকে নিজের করে নেন।’
সোনাভানের শরীর কালো চাদর জড়ানো। হাতে তসবিহ। চেহারায় যথাসম্ভব ভক্তি ফুটিয়ে সুর করে আয়াত পাঠ করে সে। তারপর মোনাজাতের জন্য হাত তোলে। ঘরের ভেতর চোখ ঘুরিয়ে দেখে নেয় সবাই দুই হাত তুলেছে কি না। ‘হে আল্লাহ্‌, তুমি তোমার নেক বান্দি সৈয়দা মনোয়ারা বেগমকে ক্ষমা করো। তাকে দয়া করো যেন  শান্তিতে থাকে, হে আল্লাহ তুমি তার কবরের আজাব মাফ করে দাও। হে আল্লাহ তার দোজখের আজাব মাফ করে দাও।’
ঘরের ভেতরে একদিকে বিশাল মেহগনির কারুকাজ করা খাট। মেঝেতে কার্পেটের ওপর সাদা চাদর বিছানো। জানালার কাছে সোফাসেট। সেখানে মনোয়ারা বেগমের বড় মেয়ে শারমিন, চোখের পাতা কান্নার  ধকলে কিছুটা ভারী এবং লালচে। সোনাভানের কথামতো দুই হাতের পাতা জোড় করে মোনাজাত ধরেছে। তার অন্যান্য বোন ও ভায়ের বউ, তাদের মেয়েরা খাটে এবং মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে দুই হাত জোড় করেছে।
ঘরের ভেতরে সৈয়দবাড়ির জনা পঁচিশেক নারী এবং শিশু। সবাইকে একঘরে জড়ো করতে বেগ পেতে হয়েছে। মনোয়ারা বেগমের খাটিয়া তার ছেলে, মেয়ে জামাইদের কাঁধে চেপে গোরস্থানে চলে গেলে, মেয়েদেরকে নিয়ে এই দোয়া দরুদ। কান্নাকাটিতে তখনকার মতো বিরতি এসেছে। বারান্দার ইজি চেয়ারে বসে অল্প অল্প দুলছে মেঝো মেয়ে শায়লা। আগুনের মতো সুন্দরী মেয়েটার চোখ বন্ধ। মনে হয় বিশ্রাম নিচ্ছে। তাকে ডাকতে গেলে বিরক্ত হয়েছিল।
চোখ খুলে সোনাভানকে দেখে অবাক হয়ে বলেছে-‘আপনি কি দোয়া পড়াবেন?’
অপ্রস্তুত হয়নি সোনাভান, বলেছে-‘নাজাত চাইব, ইস্তিগফার করব আম্মা’।
শায়লা আবার চোখ বন্ধ করে দুলতে শুরু করেছে।
শারমিন তাকে টেনে তুলেছে, বলেছে- ‘এসব ফর্মালিটিজ, পালন করতে হয়। আছোই তো আজকের দিনটা একটু কো-ওপারেট করো।’  
মনোয়ারা বেগমের পরিবারে শারমিন সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী। শুধু বড় মেয়ে হিসেবেই না, নিজে ঢাকার একটি কলেজের প্রিন্সিপাল, তার স্বামীও  হোমরাচোমরা কেউ। এসব কথা গ্রামের সবাই জানে। অনেক দিন সে গ্রামে আসে না, শুধু সে কেন, মনোয়ারা বেগমের ছয় ছেলেমেয়ের কেউই তো আসে না। তাদের মায়েরও কি আর গ্রামে এসে মৃত্যুবরণ করার কথা ছিল! সে তো বছরের অধিকাংশ সময় ছেলেমেয়ের কাছে হয় ঢাকা, না হয় লন্ডন, আমেরিকা করে বেরিয়েছে। আটাত্তর বৎসর বয়সেও  দেশ-বিদেশ করার কমতি ছিল না।
তাকে মাত্র একবার দেখার ঘটনা সোনাভানের উজ্জ্বলতম স্মৃতি। সেবার ঈদের সময় মনোয়ারা বেগমের দেয়া জাকাতের শাড়ি নিতে মেয়ের হাত ধরে এসেছিল সে এ বাড়িতে। উঁচু বারান্দায় চেয়ারে শিরদাঁড়া সোজা করে বসে পাশের স্তূপ থেকে বেছে বেছে কাপড় তুলছিলেন, আর অনেকের সঙ্গে লাইনে দাঁড়িয়ে তাকে সালাম করে সোনাভানও একটা শাড়ি পেয়েছিল। সবুজ জমিনে কালো পাড় শাড়ি। মনোয়ারা বেগম শাড়ি হাতে দিয়ে বলেছিলেন-‘কাজকামের শাড়ির কড়া রঙ ভালো। ময়লা হলেও বোঝা যায় না।’
তার শরীর থেকে ঠিকরে পড়া ফরসা আভিজাত্যের সামনে নুয়ে এসেছিল সোনাভান।
দুজন কম বয়সী তরুণী তাদের মাথায় ওড়না রাখতে পারছে না। হাত জোড় করে মোনাজাত ধরেছে বটে কিন্তু একটু পরপর ফিসফিস করে কী যেন বলছে দুজন দুজনকে। ঝুটিতে একহাত নামিয়ে অন্যের গা টিপে দিয়ে মুখ বুজে হাসছে। সোনাভানের মনোসংযোগে বিঘ্ন ঘটছে। ওরা কি তাকে নিয়ে হাসছে?
‘আস্তাগফিরুল্লাহা রাব্বি মিন কুল্লি জাম্বিওঁ ওয়া আতুবু ইলাইহি; লা হাওলা ওয়া লা কুওয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিয়্যিল আজিম’-মুখস্থ দোয়া পড়তে পড়তে আড়চোখে শারমিনকে দেখে সোনাভান। মায়ের মতো ফরসা মুখ, টিকালো নাক আর কাজল টানা চোখ বসানো, সেই সঙ্গে মায়ের কুঁচকে থাকা ভ্রুর উন্নাসিকতাও দৃশ্যমান। ভেতরে আবছা অন্ধকারের মতো গুটানো অনুভূতিকে জোর করে ঠেলে একপাশে সরায় সোনাভান। আজকে কি সে আর জাকাত নিতে এসেছে? তবু ঘরের মধ্যে বসা বিশ-পঁচিশজন  সৈয়দবাড়ির শহরবাসী নারীর মধ্যে বসে পুকুরের তলদেশ থেকে ওঠা বুদবুদের মতো অস্বস্তি ওঠে সোনাভানের।
গ্রামের সাধারণ বাড়িতে গেলে সমস্যা হয় না। হাঁস-মুরগির ওষুধ দেয়ার সুবাদে বেশির ভাগই সোনাভানের চেনাজানা মানুষ। গ্রামের মহিলা মহলে সেখানে কে কবে এসব কাজের খুঁত ধরেছে? সোনাভান নিশ্চিন্ত মনে দোয়া-দরুদ আর মোনাজাত শেষ করে হাদিয়ার টাকা নিয়ে চা-পান, খানাখাদ্য খেয়ে বাড়ি ফিরেছে।
আজকের মতো শিক্ষিত অভিজাত পরিবার তার আগে দেখা হয়নি। শারমিনের ছোট বোন শায়লা নাকি বাড়িঘর বানানোর ইঞ্জিনিয়ার। সিনেমার নায়িকাদের মতো তাদের ভাইয়ের বউ যে ইংল্যান্ড থেকে দুটি ফুটফুটে শিশু নিয়ে এসেছে। ফেরেশতার বাচ্চার মতো ছেলেটা সাদা পাঞ্জাবি পরে বাপের সঙ্গে দাদিকে কবর দিতে চলে গেল। আর মেয়েটা মাথায় ওড়না দিয়ে মায়ের কোল ঘেঁষে মোনাজাত ধরেছে। একটু পরপর হাত বিছিয়ে ওড়না সোজা করে সবাইকে দেখে আবার মোনাজাতের হাত জোড় করছে। সোনাভানের চোখ সেখানে আটকে গেলে আর ফেরাতে পারে না। আহা, তার করিমন্নেসা যে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে ইহজগত ত্যাগ করল, সে বাচ্চাটা বেঁচে থাকলে এমন চেহারা পেত কি!
‘বান্দার নেকিই শুদু সঙ্গে যাবে। হে আল্লাহ আপনি মনোয়ারা বেগমের সকল নেকি কবুল করে নিন।’ সোনাভান একমনে আরবিতে দোয়া উচ্চারণ করে বাংলাতে মৃতের আত্মার জন্য প্রার্থনা করে, যেন তার কবরের আজাব মাফ হয়, আল্লাহ যেন মৃতা মনোয়ারা বেগমের সব গুণাহ-গাতা মাফ করে তার দোজখের শাস্তি কম করেন। তার কণ্ঠস্বর মিহি হয়ে বিনিয়ে বিনিয়ে কান্নার মতো শোনায়।
-‘দোয়া ছোট করেন।’ - শারমিনের আদেশের কণ্ঠস্বরে সামান্য হকচকিয়ে যায় সোনাভান। ‘এত লম্বা দোয়ার দরকার নাই, সবাই নিজে নিজে দোয়া করবে। আমাদের মা অনেক পরহেজগার মানুষ ছিলেন।’ হঠাৎ কি কারণে শারমিন রেগে যায় বুঝতে পারে না সোনাভান।
ঝটপট মোনাজাত শেষ করে। তার হঠাৎ গরম লাগতে শুরু করে। মাথার ওপরে ফ্যান বন্ধ! না তো! সবাই তার দিকে তাকিয়ে আছে। কথার গুঞ্জরন। চাদরের ভেতর দিয়ে পিঠে হাতিয়ে নিতে ইচ্ছে করছে। ডানার কাছটা কি খালি খালি লাগছে! জামা-কাপড়, চাদরের ভেতরে ফাঁপা বাতাস ঢুকে নিজেকে গোটানো খালি বস্তা মনে হচ্ছে।
শারমিনদের ইংল্যান্ডে থাকা ভায়ের বউ  বেমক্কা প্রশ্ন করে-’এত গরমে আপনি এমন ভারী চাদর গায়ে চাপিয়েছেন কেন?’
স্রোতে ভেসে যাওয়ার আগে পিপীলিকার মতো নিজের সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করে কুটো আঁকড়ে ধরার মতো করে সোনাভান, বলে- ‘পর্দা করি আম্মা, আল্লাহর কাজ করতে চাইলে, সহি পর্দাপুষিদা দরকার।’
-‘কিন্তু এই গরমে শরীর বাতাস না পেলে আপনার চর্মরোগ হবে’। মেয়েটির চুলের রঙ লালচে সোনালি, ধবধবে গায়ের রঙে সাদা সালোয়ার কামিজ। ননদের সঙ্গে কী নিয়ে যেন হাসে।
সোনাভান চর্মরোগ সম্পর্কে জানে। সে গম্ভীর হয়- ‘আম্মাগো, আল্লা রোগবালাই দিলে কি করব, মাথা পাইতা নিব, তিনিই রাখেন তিনিই মারেন।’  
শায়লা হঠাৎ জানতে চায়-‘এইসব দোয়া পড়ানো কোত্থেকে শিখলেন?’
জাহেরা বেওয়ার নাম ভক্তিসহকারে বলতে পেরে ভালো লাগে সোনাভানের।
-‘সেটা আবার কে?’ শারমিনের ভ্রু আরেকটু কুচকে যায়।
শারমিনের ভায়ের বউ হাল ছেড়ে দেবার ভঙ্গিতে ননদদের দিকে চেয়ে চোখমুখে যে ভঙ্গি করে তার অর্থ সোনাভান বুঝতে পারে না। তিনজনের কেউ কেউ চট করে সোনাভানকে দেখে নিয়ে আবার নিজেদের মধ্যে ফিরে যায়। তারা কখন রওনা দিলে ঢাকা পৌঁছাতে ক’টা বাজবে এসব নিয়ে আলাপ জুড়ে দেয়।    
জাহেরা বুবুর মতো গুণী এবং নেকবতীর কথা গুছিয়ে বলতে নিয়ে সোনাভান বোঝে কেউ তার কাছে উত্তর আশা করছে না।
এদের কাছ থেকে দ্রুত সরে পড়তে হবে। কিন্তু ধীরস্থির থাকা জাহেরা বেওয়ার শিক্ষা পেয়েছে সোনাভান। উঠে দাঁড়িয়ে বাথরুম খোঁজে। মনোয়ারা বেগমের শোবার ঘরের সঙ্গে বাথরুম। কেউ একজন তাকে দেখিয়ে দেয়।
ঝকঝকে মোজাইক করা মেঝে, পরিষ্কার কমোডের পাশে সাদা বেসিনের ওপরে বড় আয়না। দাগহীন। আয়নায় নিজের মুখ দেখে হকচকিয়ে যায় সোনাভান। এই আয়নাতে তার কপালের শিরা বের হওয়া পোড়া চেহারাই শুধু দেখা যাচ্ছে তা না, তার শরীরের প্রায় সবটা দৃশ্যমান। ঘাড় ঘুরিয়ে পিঠের অর্ধেক দেখা যায়।
বুকের ভেতর কাঁপুনি শুরু হয়েছে সোনাভানের। গায়ের চাদর খুলে মেঝেতে ফেলে দেয়। শাড়ির নিচে ঢলঢলে সাদা ব্লাউজ, ক্ষিপ্র হাতে টিপ বোতাম খোলে। না পিঠে কোনো টান লাগছে না। কিন্তু কী এক অজানা আতঙ্কে চোখ বন্ধ করে ফেলে সোনাভান। সামনে আয়না, সে কি আগে চোখ খুলবে, নাকি আগে হাত দিয়ে নিজের পিঠ স্পর্শ করে দেখবে এর অস্তিত্ব?
চোখ খুলেই সে কি দেখবে এক স্বপ্নের বোরাক? যে কিনা মেঘের ভেতর দিয়ে উড়ে যাবে, পেছনের সব সত্য তার শরীর থেকে খসে পড়বে।  
দুটো কাজ একযোগে করে ফেলে সোনাভান। চোখ খোলে এবং পিঠ ঘুরিয়ে আয়নাতে দেখতে দেখতে নিজের পিঠ হাতায়। কিন্তু কোথায় তার সদ্য গজানো পাখনা? মুখের চামড়া পোড় খাওয়া হলেও পিঠ তার এখনো মসৃণ, কাঁধের নিচে গজানো তার পাখনা কই?
কোনো গভীর বুকের ধন হারানোর মতো শূন্যতা ঘিরে ধরে সোনাভানকে। মনে হয় দ্বিতীয় বারের মতো তার করিমন্নেসা মরে গেছে। সেই লাশ আগলে বসে আছে সদ্য সন্তানহারা সোনাভান।