করোনাকাল
বিচ্ছিন্ন অনুভব
মাহফুজা হিলালী

প্রবন্ধ
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান
শামসুজ্জামান খান

গল্প
ডায়মন্ড লেডি ও পাথর মানব
হামিদ কায়সার

গদ্য
নিদ্রা হরণ করেছিল যে বই
মিনার মনসুর

নিবন্ধ
পঞ্চকবির আসর
সায়কা শর্মিন

বিশ্বসাহিত্য
আইজাক আসিমভের সায়েন্স ফিকশন
অনুবাদ: সোহরাব সুমন

বিশেষ রচনা
প্রথম মহাকাব্যনায়ক গিলগামেশ
কামাল রাহমান

শ্রদ্ধাঞ্জলি
মুজিব জন্মশতবর্ষ
মারুফ রায়হান
 
সাক্ষাৎকার
কথাশিল্পী শওকত আলী

জীবনকথা
রাকীব হাসান

ভ্রমণ
ইম্ফলের দিনরাত্রি
হামিদ কায়সার

ইশতিয়াক আলম
শার্লক হোমস মিউজিয়াম

নিউইর্কের দিনলিপি
আহমাদ মাযহার

শিল্পকলা
রঙের সংগীত, মোমোর মাতিস
ইফতেখারুল ইসলাম

বইমেলার কড়চা
কামরুল হাসান

নাজিম হিকমাতের কবিতা
ভাবানুবাদ: খন্দকার ওমর আনোয়ার

উপন্যাস
আলথুসার
মাসরুর আরেফিন

এবং
কবিতা: করেনাদিনের চরণ

১৪ বর্ষ সংখ্যা ০১
আগস্ট ২০২১

লেখক-সংবাদ :





মা পৃথিবী মা প্রকৃতি
রাকীব হাসান
আমার স্ত্রী নাহার মনিকা একজন স্বনামধন্য কবি এবং কথাসাহিত্যিক, জীবনের এই পরিচয় একজন মানুষের সৃষ্টিশীলতার এক আনন্দময় পরিচয়। আমি ত্রিশ বছর ধরে ছবি আঁকি, পঁচিশটি একক প্রদর্শনী করেছি পৃথিবীজুড়ে। ছবি আঁকার পাশাপাশি কবিতা লিখি। এক ঘরে বসবাস করেও আমাদের আছে দুই আলাদা জগত। আমরা দুই বলয়ে সমান্তরাল দুইটি পথ। তারপরও একদিন যমজ কন্যা চারণ আর চিত্রণের জন্মে সমান্তরাল মিলিয়ে যুথিবদ্ধ চারজন। এই যে আমাদের চারজনের জীবন, সে এক অপূর্ব ঘোরের রঙের বায়েস্কোপ! এই এক মোহমায়া, যার ভিতরে বয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর দেয়া আমাদের সময়।

এই জীবনে পঁচিশ থেকে ত্রিশ হাজার দিন আমরা স্বাভাবিক ভাবে বেঁচে থাকি। কারো কারো ভাগ্যে এতো দিন জোটে না, আবার কারো ভাগ্যে বেশিও জোটে। তবে জীবনের পকেটে পঁচিশ থেকে ত্রিশ হাজার দিন আছে এই সম্ভাবনাটা প্রায় সত্যের মতো। এইসব দিন আমরা বেহিসেবে যেমন খরচ করতে পারি আবার গুছিয়েও খরচ করতে পারি। জন্মের পড়ে মায়ের কোলে একটি শিশু তার জীবনের একাউন্ট খুলে দিন খরচের পালা শুরু করে। সন্তানের দিনগুলির সাথে মায়ের দিনগুলিও খরচ হতে থাকে। একজন মায়ের জীবনের কতগুলি দিন খরচ হয় সন্তানের জীবনে?

আমরা অলৌকিক কোন অটোমেটেড সিস্টেমে পৃথিবীতে অবতরণ করি না। শরীরের ভিতরে ২৮০ দিন, একজন মা সন্তানকে পৃথিবী উপযুক্ত করে জন্ম দেন। জন্মের পরে যদি ধর্মের কোন সংস্কৃতি আমাদের জোর করে না দেয়া হতো তবে আমরা মা'কেই মানব সৃষ্টির আধার মনে করতাম। প্রকৃতির এই সত্যকে মেনে নিলে মা-ই আমাদের প্রথম মৌলিক পরিচয়। এই জীবনের চারপাশে যতবার তাকাই, কেবলই মনে হয়, কোথাও কোনো ঈশ্বর নেই, যদিও থাকেন তিনি কোনো মানবসৃষ্ট ধর্মে সংযুক্ত নন, তিনি মাতৃত্বে বিলীন। সহস্র লক্ষ কোটি বছর জীবনের সাথে ঈশ্বর আছেন, জন্মে জন্মে জীবিত।

আমার মায়ের জীবনে মাদার্স ডে ছিলো না। সন্তান জন্ম, সংসার আর বাবার ভালোবাসা এই ছিলো তাঁর জীবনের একমাত্র পাওয়া। মা দিবসে ফুল আর উপহার নিয়ে মাকে গিয়ে জড়িয়ে ধরে, মাকে নিয়ে বেড়াতে যাওয়া হয়নি। আমাদের সময়ের মা মানেই ঘরবন্দী একটা জীবন। এই করোনা কালে আমরা নিশ্চয়ই বুঝতে শিখেছি কেমন এই ঘরবন্দী জীবন! কোনো মানুষের জন্য এটা কাঙ্ক্ষিত হতে পারে না। আমাদের মায়েরা অভ্যস্ত হয়েছিলেন এই বাড়িবন্দী জীবনে, যেমন করে চিড়িয়াখানার প্রাণীরা অভ্যস্ত হয়ে যায়! সময় তাঁর পক্ষে ছিলো না, সমাজ তার পক্ষে ছিলো না, এমনকি রাষ্ট্রও তখন মায়েদের জন্য আলাদা কিছু ভাবতে শেখেনি।

আজ পৃথিবীর সর্বত্র মা'কে নিয়ে ভাবছে, তাঁর আসন নিয়ে আধুনিক জগত ভাবতে পারছে এটা আনন্দের। আমি উপলব্ধি করি, মা দিবস আমাদের এই পৃথিবীর সুন্দরতম দিন। এখন একজন মা জানেন তাঁর একটি দিন আছে, তাঁর নিজস্ব দিন, তাঁর অস্তিত্বের দিন। যিনি আশি বছর বেঁচে থাকবেন আশিটি দিন নিজের জন্য স্বীকৃত। যদিও নানারকম বিতর্ক আছে এই দিন নিয়ে। তবু আমার কাছে এইসব দিবসের মূল্য আছে। এই দিবস থেকেই দিনের আলোর সঙ্গ পাওয়া যায়। মা দিবসকে প্রতীকী ধরে আমরা একটা মুক্তির ওপেনিং-এর দিকে যেতে পারছি।
অনেকে মনে করেন মা দিবস কর্পরেটদের একটি ব্যবসায়িক ফন্দি। আগামী প্রজন্মকে কাজে, মোহে এরা এমনভাবে বন্দী করে ফেলবে যে, মা দিবসই হবে কেবল মাকে মনে করার একমাত্র দিন। এসবও উড়িয়ে দেয়ার উপায় নেই। আমি কথা বলি আমার মেয়েদের সঙ্গে, কেমন হবে আগামী দিনগুলি, কেমন হবে মায়েদের সঙ্গে সন্তানদের সম্পর্ক? কর্পরেট দুনিয়া সোনার রাজহাঁসের প্রতিদিন একটি করে ডিম পাড়ার প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া মানে না, তাদের প্রয়োজন হবে অসংখ্য ডিম। প্রকৃতি এবং মাতৃত্ব দুই-ই ধীর-স্থির, এখানে বাস করতে হলে প্রতিদিন একটি ডিমের বেশি পাওয়া যাবে না। আমরা কি আদৌ ফিরে যেতে পারবো প্রকৃতির কাছে, মাতৃত্বের কাছে?

মা-বাবা এবং পরিবার নিয়ে বর্তমান প্রজন্মের ভাবনা কেমন? এ নিয়ে প্রায়শ কথা হয় আমাদের মেয়েদের সঙ্গে, ওদের চিন্তা দেখে আমি আশাবাদী হই। এবছর সেপ্টেম্বরে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছে, তাদের মতামতকে গুরুত্ব দিলে ভবিষ্যৎ অতটা অন্ধকার মনে হয় না। প্রথমত, প্রকৃতি নিয়ে বর্তমান প্রজন্ম আমাদের সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। এই প্রজন্মের একটা বিশাল অংশ, মানুষের মঙ্গল গ্রহে যাওয়াকে বেশি জরুরী মনে করে না, এই বিশাল অঙ্কের অর্থ মাদার নেচারের কাজে ব্যয় করলে তার ক্ষত অনেকটাই সারিয়ে তোলা সম্ভব। পাশাপাশি এদের জীবন ধারণের পদ্ধতিগত পরিবর্তনও পরিষ্কার! এরা আজকের পৃথিবীর সমস্ত আধুনিক ভোগবিলাসের পাশাপাশি পারিবারিক বন্ধনও অটুট চায়। এদের চিন্তায় দেখি, এরা পরিবারের পাওনা সময়টাকে বাদ দিয়ে কোন ভোগবিলাসের দিকে যেতে চায় না। সবচেয়ে আসার কথা এরা মনে করছে, পরিবারের সাথে সময় কাটানো যে কোন বিনোদনের চেয়ে কম আনন্দের নয়। এই রকম প্রজন্মের কাছে মা দিবসের প্রয়োজন ছিলো। এরা জীবনের সঙ্গে বাণিজ্যের ফারাকটা দেখতে পায় এবং সভ্যতার পাশে রাজনীতির ভালোমন্দ যাচাই করতে জানে। মা দিবস নিয়ে বিতর্ক আছে এই জেনারেশনের কাছে। ২৫-৩০ হাজার দিন থেকে মাকে যে ৮০ টি দিন দিচ্ছে এই সমাজ, সেটি একটি হাস্যকর হঠকারিতা যদি না, একজন মা পারিবারিক ও সামাজিক বলয়ে পিতার মতো সমান সম্মানিত না হন, রাষ্ট্রে নারীর ক্ষমতায়ন পুরুষের সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে না হয়। সন্তান জন্মের পরে একজন নারীর যে শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন হয়, তার কারণে সে কর্মক্ষেত্রে একজন পুরুষের থেকে পিছিয়ে পড়ে, এই পরিস্থিতির সমাধান কিভাবে হবে? একজন নারীকে একজন পুরুষের মতো সমস্ত ক্ষমতা এবং অধিকার দেয়ার পরেও তার সন্তান ধারণের প্রয়োজনে তাকে পুরুষের চেয়ে এগিয়ে রাখতে হবে। দুই কন্যার প্রশ্ন এবং দাবীর পাশে বসে আমরা তিনজন হই, এরকম দিন নিশ্চয়ই একদিন আসবে, একদিন মা দিবস পরিপূর্ণতা পাবে। এই দিনটি হবে পৃথিবীর সুন্দরতম দিন।

মায়ের মৃত্যুর পরে জেনেছিলাম আমার যা গেছে তার হিসেব আমি জানি, মা কেমন ছিলেন, মা কি ছিলেন! মা যখন চলে গেছেন, তখন আমাদের পরিবারে বোনেরা সকলেই মা হয়েছেন। আমরা ভাইদের সকলের ঘরে একজন মা তার সন্তান নিয়ে উপস্থিত। মা চলে গেছেন, এবং তাঁর গর্ভ থেকে অসংখ্য মায়ের আবির্ভাব এই পৃথিবীতে। এভাবেই পৃথিবী বেঁচে থাকে। মানব সভ্যতায় এই মহাবিশ্বে এখনো পৃথিবীই একমাত্র জীবনদাত্রী মা, সেই চিন্তা এবং নিয়মে পৃথিবী মাতৃময়, আমরা আসলে মৃত্যু পর্যন্ত মাতৃগর্ভেই বাস করি।

একটি মায়ের জীবনের কতগুলি দিন খরচ হয় সন্তানের জীবনে? এই প্রশ্নের উত্তর পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রকে অবশ্যই পরিষ্কার জানতে হবে। শুধু নারী নয়, প্রকৃতির সকল মাতৃত্বের জন্য মা দিবসের ভালোবাসা মানুষের আলিঙ্গনে বেঁচে থাকুক।