করোনাকাল
বিচ্ছিন্ন অনুভব
মাহফুজা হিলালী

প্রবন্ধ
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান
শামসুজ্জামান খান

গল্প
ডায়মন্ড লেডি ও পাথর মানব
হামিদ কায়সার

গদ্য
নিদ্রা হরণ করেছিল যে বই
মিনার মনসুর

নিবন্ধ
পঞ্চকবির আসর
সায়কা শর্মিন

বিশ্বসাহিত্য
আইজাক আসিমভের সায়েন্স ফিকশন
অনুবাদ: সোহরাব সুমন

বিশেষ রচনা
প্রথম মহাকাব্যনায়ক গিলগামেশ
কামাল রাহমান

শ্রদ্ধাঞ্জলি
মুজিব জন্মশতবর্ষ
মারুফ রায়হান
 
সাক্ষাৎকার
কথাশিল্পী শওকত আলী

জীবনকথা
রাকীব হাসান

ভ্রমণ
ইম্ফলের দিনরাত্রি
হামিদ কায়সার

ইশতিয়াক আলম
শার্লক হোমস মিউজিয়াম

নিউইর্কের দিনলিপি
আহমাদ মাযহার

শিল্পকলা
রঙের সংগীত, মোমোর মাতিস
ইফতেখারুল ইসলাম

বইমেলার কড়চা
কামরুল হাসান

নাজিম হিকমাতের কবিতা
ভাবানুবাদ: খন্দকার ওমর আনোয়ার

উপন্যাস
আলথুসার
মাসরুর আরেফিন

এবং
কবিতা: করেনাদিনের চরণ

১৫ বর্ষ ০৩ সংখ্যা
অক্টোবর ২০২২

লেখক-সংবাদ :





মানিপ্ল্যান্টের খোঁজে
ফয়জুল ইসলাম
শিহাব মেয়েটার বিষাদগ্রস্ত চোখের দিকে তাকায় এবং খুবই আশ্চর্য হয় সদা হাসিখুশি মেয়েটার উজ্জ্বল চোখে বিষাদের প্রগাঢ় ছায়া দেখতে পেয়ে যখন মেয়েটা শিহাবকে বলে: মানিপ্ল্যান্টটা মইরাই গেল, দেখলা! যুথি এত দায়িত্বজ্ঞানহীন মানুষ! ভাবতেই পারতেছি না আমি! তোমার সাথে থাকব বইলা মাত্র একমাসের জন্যে আমি চিটাগং গেলাম। গাছটা রাইখা গেলাম যুথির কাছে; বল্লাম যে ঠিকঠাক মতন যতœ নিস কিন্তু! আর যুথি গাছটা মাইরাই ফেল্ল! সে গাছে পানি টানি কিছু দিছে বইলা তো মনে হয় না! অথচ দেখ, তারে আমি প্রায় প্রত্যেকদিনই ফোনে মনে করায়া দিছি!
শিহাব সেই শ্যামবর্ণের মেয়েটার বিষাদগ্রস্ত চোখের দিকে তাকায় এবং সংক্ষেপে মন্তব্য করে: বাদ দেও তো! তোমার বন্ধুর কোনো দোষ নাও থাকতে পারে! হয়ত পানি দিছিল ঠিকই। পানির পরিমাণডা হয়ত বুঝতেই পারে নাই। মাঘমাসের টানে মাটি হয়ত খুব বেশি শুকাইয়া গেছিল! মনে হয়, যুথি সেইডা খেয়ালই করে নাই। আর এমনো হইতে পারে যে সে টবটায় প্রয়োজনের থেইকাও বেশিই পানি দিয়া ফেলছে সে আর পইচা গেছে গাছের শিকড়! যা হইছে, হইছে! বাদ দেও তো!
শিহাব রেশমসম বাদামি চুলের সহধর্মিনীর বিষাদগ্রস্ত চোখের দিকে আবারো তাকায়। মেয়েটাকে সে বলে না যে সে মেয়েটার ঘনিষ্ঠ বন্ধু যুথির ঊপরে ভয়ানকভবে ক্ষিপ্ত! তার সহধর্মিনী টুম্পা যুথির কোনো সমালোচনা সহ্য করতে পারে না কোনোদিনই। যদিও এই মুহূর্তে মানিপ্ল্যান্টটা মরে যাওয়ার জন্য টুম্পা যুথিকে দায়ি করছে, কিন্তু খুব জলদিই সে যুথিকে ক্ষমাও করে দেবেÑ এটা তো জানা কথা। শিহাবকে সে হয়ত বলবে: কী আর করা! আমি তোমার জন্যে আরেকটা মানিপ্ল্যান্ট কিন্না নিয়া আসব।  
শিহাব টুম্পার বিষাদগ্রস্ত চোখের দিকে তাকায় এবং টুম্পার মনের মতো করে কথা বলতে সে সচেষ্ট হয়: আরেকটা মানিপ্ল্যান্ট কিন্না আনলেই তো মিট্টা যায়!
শিহাব টুম্পার চোখে তবুও স্বস্তি লক্ষ করে না। মেয়েটার কন্ঠাস্থির সম্মিলনের ছোট্ট কাল তিলটাকে তার অবিশ্বাস্য রকমের ম্রিয়মান বলে মনে হয়। টুম্পা তার কথার পিঠে কথা উত্তর করে: তা না-হয় নতুন একটা মানিপ্ল্যান্ট কিন্নাই আনলাম! কিন্তু আমাদের এত্ত আদরের গাছটার মৃত্যু আমি কিছুতেই মাইনা নিতে পারতেছি না!  
জিগাতলা পোস্ট অফিসের ঠিক উল্টোদিকের দোতলায় টুম্পা আর তার ভাড়া করা বাসার শোয়ার ঘর থেকে তখন উঠে যায় ব্যথিত শিহাব এবং বারান্দার অন্ধকারে বসে সে সিগারেট টানতে থাকে। তার মনে পড়ে, চৌদ্দ বছর আগে, যখন সে আর টুম্পা একসাথে থাকার পরিকল্পনা করত আর ঘুরে বেড়াত শহরময়, তখন কোনো একদিনে টুম্পা তাকে ঐ মানিপ্ল্যান্টটা কিনে দিয়েছিল মণিপুরিপাড়ার একটা দোকান থেকে। তারপর অনেক আদরে গাছটাকে বড় করেছে সে আর টুম্পা। কাজেই মানিপ্ল্যান্টটার আকস্মিক মৃত্যুর কারণে যুথিকে ক্ষমা করতে পারাটা অন্তত শিহাবের জন্য বেশ কঠিন।  
শিহাব কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে উপ-পরিচালক হিসাবে চাকরি করে। সে একজন মৃত্তিকাবিজ্ঞানি। আর টুম্পা রাইফেলস পাবলিক স্কুলে বিজ্ঞান পড়ায়। গেলবছর ঢাকার খামারবাড়ির হেড অফিস থেকে চট্টগ্রাম শহরের আঞ্চলিক অফিসে শিহাবকে বদলি করা হয়। তার এবং টুম্পার একমাত্র ছেলে নয় বছরের নাবিল তখন ক্লাস ফোরে পড়ে সেই রাইফেলস পাবলিক স্কুলেই। তাই টুম্পার কাজ আর নাবিলের স্কুল ফেলে শিহাবের সাথে তাদের চট্টগ্রাম চলে যাওয়া হয় না। মনখারাপ নিয়েই চট্টগ্রাম শহরের আগ্রাবাদে আঞ্চলিক অফিসে যোগ দেয় শিহাব এবং সে অফিসের কাছাকাছি, জাম্বুরি মাঠের পুবপাশে, একটা বাসা ভাড়া নেয়। কখনো প্রতিসপ্তাহে কখনো এক সপ্তাহ পরপর চলতে থাকে তার ঢাকা-চট্টগ্রাম-ঢাকা ভ্রমণ। এভাবে চট্টগ্রামে সে একা একা এক বছর পার করে দেয়। জোর তদবিরে তখন চট্টগ্রাম থেকে শিহাবের বদলি হয় ঢাকার হেড অফিসে। ডিসেম্বরে তাদের ছেলের বার্ষিক পরীক্ষা হয়ে গেলে টুম্পা ছেলেকে নিয়ে একমাসের জন্য তার চট্টগ্রামের বাসাতে থাকতে যায়। সেটাই শিহাবের চট্টগ্রাম-বাসের শেষমাস। সেই প্রথম এবং শেষ তার সাথে মা আর ছেলের চট্টগ্রামে থাকতে যাওয়া। টুম্পা আর নাবিলের সাথে টানা অনেকদিন থাকতে পারার আনন্দের ভেতরে শিহাব টুম্পার কাছে তার শঙ্কা প্রকাশ করে: যুথির হাতে তুমি যে মানিপ্ল্যান্টটা রাইখা আসলা, সে ঠিকমতো যতœআত্তি করব তো?
টুম্পা বেশ বিরক্তি নিয়েই তখন উত্তর করে: যুথি যে খুব এলোমেলো সেইটা তুমিও জান, আমিও জানি। কিন্তু সবসময় তার ওপরে এত অনাস্থা দেখানোর দরকার নাই। আমার প্রিয় মানিপ্ল্যান্টটা আমি বুইঝাশুইনাই তার হাওলায় রাইখা আসছি। প্রতিদিন সন্ধ্যায় ও আমাদের বাসায় গিয়া গাছে পানি দিয়া আসবে বলছে।
শঙ্কা নিয়েই টুম্পাকে শিহাব বলে: তা হইলে তো আর দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নাই। তুমি যখন বলতেছ!
কিন্তু টুম্পার প্রিয় বন্ধু যুথির প্রতি সমূহ অনাস্থার কারণে শিহাবের মনের ভেতরে তখন খচখচ করতেই থাকে। বলে রাখা দরকার যে যুথি তার অনেকগুলো সিডি আর গল্পের বই হারিয়ে যাওয়ার জন্য দায়ী। আশ্চর্যের ব্যাপার, অন্যের সিডি বা গল্পের বই হারিয়ে ফেলেও যুথির কোনো মনস্তাপ নাই! যুথি বলে: আপনের সিডি আর গল্পের বইগুলা যে কে কই নিয়া গেল, তা আর আমি মনে করতে পারি না। দুর্ঘটনাটা ঘইটা গেছে আর কি! তাই সেমুহূর্তে শিহাবের ভেতরে যুথিকে নিয়ে তার দ্বিতীয় আশঙ্কাটা ঘুরতে থাকে: যুথি না আবার শেষে বাসার চাবিটাই হারিয়ে ফেলে! কিন্তু তার এই দ্বিতীয় আশঙ্কাটার কথা টুম্পাকে বলা যায় না। যুথি-বন্ধুর সমালোচনা করাতে শিহাবের ওপরে টুম্পার মেজাজ বিগড়িয়ে যেতে পারে এবং বন্ধ হয়ে যেতে পারে সপরিবারে তাদের কাপ্ত্বাই লেকে বেড়াতে যাওয়াটা। শিহাব সেটা চায় না।
টুম্পা আর তাদের ছেলে নয় বছরের নাবিলকে নিয়ে এক মাস পরে অর্থাৎ ফাল্গুনমাসের পয়লাতে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাতে ফিরে আসে শিহাব। তারপর সে জানতে পারে যে যুথির হাওলায় রেখে যাওয়া মানিপ্ল্যান্টটা কোনো কারণে মরে গেছে। টুম্পাই তাকে মর্মান্তিক খবরটা দেয় এবং তাদের প্রিয় গাছের মৃত্যুতে তারা দু’জনেই সমানভাবে আজকে, এই মুহূর্তে, বিমর্ষ হয়ে যায়। পাতলাসাতলা মানিপ্ল্যান্টটার ছোটো ছোটো পাতারা, যাদের হালকা সবুজ জমিনের ভেতরে হালকা হলুদ ছোপ দেয়া ছিল, টুম্পা আর শিহাবের স্মৃতির ভেতরে ক্রমাগত দোল খেতে থাকে। প্রিয় মানিপ্ল্যান্টটাকে আর কোনোদিন দেখতে পাবে না ভেবে তাদের অন্তরের গভীরে খুবই হাহাকার জাগে।  যুথিকে তার দায়িত্বজ্ঞানহীনতার জন্য সমালোচনা করেও শান্তি পায় না তাদের দু’জনের কেঊই।
এক বছর পরে ঢাকায় ফিরে এসে পুরনো ছন্দ ফিরে পায় শিহাব। আগের মতোই কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হেড অফিস খামারবাড়িতে অফিস করে মৃত্তিকাবিজ্ঞানি, সন্ধ্যায় তাদের জিগাতলার দু’তলা বাসাটার বারান্দায় টুম্পার সাথে বসে সে আগের মতোই চা খায় আর টবে বোনা বিভিন্ন গাছের পরিচর্যা করে, এক দিন পরপর আব্বা-আম্মাকে দেখতে সে শংকরের ১০৬ নম্বর চেয়ারম্যান গলিতে যায় এবং শংকর থেকে জিগাতলার বাসায় ফেরার পথে শংকরমোড়ের সিটি কাফেতে বন্ধুদের সাথে সে আড্ডা মারে খানিকক্ষণ। চট্টগ্রামের একাকী জীবনযাপনের দুঃসহ স্মৃতি তখন ভুলে যেতে শুরু করে শিহাব। সে যতই এশহরের প্রাণের কাছে ফিরতে থাকে ততই তার মনে হতে থাকেÑ কী যেন নাই, কী যেন নাই! এবং সে বিলক্ষণ বুঝতে পারে যে মৃত মানিপ্ল্যান্টটাই তার শূন্যতার কারণ। বারান্দার গ্রিলে সেই অপরূপ মানিপ্ল্যান্টটা আর শতপত্র মেলে দিয়ে সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকে না। তখন যুথির ওপরে তার মেজাজ খারাপ হয় ভীষণ এবং যুথির বন্ধু টুম্পার সাথে দিল্লাগি তার অসহ্য লাগে।   
চৌদ্দ বছর আগে এক বর্ষার দিনে টুম্পা শিহাবের খামারবাড়ির অফিসে বেড়াতে যায়। লেকসার্কাসের টুম্পা তখন পদার্থ বিজ্ঞানে মাস্টার্স শেষ করে, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়ে, একবছর মতো চাকরিটাকরি খুঁজে সবে রাইফেলস পাবলিক স্কুলের মাস্টারনি। শিহাবের অফিসরুমে বসেই টুম্পা বলে: তোমার রুমটা না খুবই কুৎসিত দেখতে! একে তো দেয়ালগুলো ড্যাম্প, তার ওপরে আবার টেবিলে দুনিয়ার খয়েরি ফাইল আর কাগজপত্তর এলোমেলো কইরা ফালায় রাখছ!
টুম্পা যে এভাবে স্কুলের ক্লাস নেয়া ফেলে হঠাৎ করে তার অফিসে চলে আসবে তা কল্পনাও করে নাই শিহাব। তদুপরি নিজের টেবিল সম্পর্কে টুম্পার পর্যবেক্ষণ জেনে ভ্যাবাচ্যাকা লেগে যায় তার। দীর্ঘদিন ধরে টেবিলে জমে থাকা ফাইল আর কাগজপত্তরগুলো সে ত্রস্তে গুছাতে বসে। তখন সে টুম্পাকে বলতে শোনে: পরে টেবিল ঠিক কইরো মিয়া! তোমার জন্যে একটা মানিপ্ল্যান্ট নিয়ে আসছি মণিপুরিপাড়ার একটা দোকান থেইকা। গাছটাছ থাকলে তোমার ঘরটার চেহারা যদি একটু ভালটাল হয়!
এই বলে টুম্পা একটা পলিথিনের ব্যাগ থেকে ছোটো একটা স্বচ্ছ কাঁচের টব বের করে শিহাবের হাতের ডাইনের নিচু সাইড টেবিলটায় রাখে। টবটার তিন-চতুর্থাংশ পর্যন্ত সাদা সাদা নুড়িতে ভরা। নুড়ির ভেতরে ছোটো ছোটো তিনটা নবীন মানিপ্ল্যান্ট। টুম্পা শিহাবের পানির বোতল থেকে পানি ঢেলে মানিপ্ল্যান্টগুলোর আশপাশের সাদা নুড়ি ভিজিয়ে দেয়। জানলা দিয়ে সাইড টেবিলটায় এসে পড়ে সকাল এগারটার উজ্জ্বল আলো। আর তা’তে জ্বলজ্বল করে ওঠে মানিপ্ল্যান্টের হলুদ ছোপ দেয়া হালকা সবুজ পাতারা। গাছটার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে শিহাব। তার মনে হয়, এঘরে টুম্পা না-থাকুক, টুম্পার প্রতিনিধি তো থাকল!
টুম্পা আরো বলে: প্রত্যেকদিন অফিসে আইসা এই গাছটায় পানি দিবা কিন্তু! নুড়ির ভিতর থেইকা জলদি জলদি পানি উইড়া যায় তা তোমার মতো একজন মৃত্তিকাবিজ্ঞানির ভাল কইরাই জানার কথা।
কাজেই টুম্পার কথা মতো প্রত্যেকদিন অফিসে ঢুকে পয়লাতেই শিহাব স্বচ্ছ কাঁচের টবে সাদা নুড়ির ভেতরে রাখা তিনটা ছোটো ছোটো মানিপ্ল্যান্টের চাড়ার কাছে যায় এবং চাড়াদের গোড়ায় একটু করে পানি দিয়ে সে তার দিন শুরু করে। একমাসের মধ্যে আলো আর জলে বাড়তে বাড়তে গাছগুলো দেড় ইঞ্চি থেকে প্রায় দু’ইঞ্চিতে দাঁড়ায়। তখন কোনো একসকালে অফিসে যাওয়ার পরে দেখা যায়, তিনটা মানিপ্ল্যান্টের চাড়ার একটা কাটা পড়েছে ঠিক গোড়া থেকে। কী ব্যাপার? পরিষ্কার বোঝা যায় যে কোনো গেছোইন্দুর আগের মতোই জানলার ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢুকে কিছু কাগজপত্তরের সাথে সাথে মানিপ্ল্যান্টের চাড়াটা কেটে ফেলেছে এবং চাড়াটার শেকড়বিহীন কাণ্ড পড়ে আছে সাইড টেবিলের ওপরেই। শিহাবের তখন ভয় হয়, এসব ফাজিল ইন্দুরেরা মানিপ্ল্যান্টের আর দু’টো চাড়াও তো যে কোনোদিন কেটে ফেলতে পারে! সেই আশঙ্কাতে শিহাব অফিস থেকে মানিপ্ল্যান্ট বসানো কাঁচের টবটা তাদের শংকরের বাসাতে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।      
চৌদ্দ বছর আগে এক বর্ষার দিনে টুম্পার দেয়া মানিপ্ল্যান্ট এভাবে পৌঁছিয়ে যায় শংকরের ১০৬ নম্বর চেয়ারম্যান গলিতে। শিহাবের ঘরের দক্ষিণের জানলার কাছে একটা টেবিল। টেবিলের ওপর কাঁচের ছোটো টবটার ভেতরে টুম্পার দেয়া মানিপ্ল্যান্টটা বসে থাকে প্রায় মাস দুয়েক। কিন্তু দু’ইঞ্চি উচ্চতা থেকে মানিপ্ল্যান্টটা তেমন একটা আর বড় হয় না। কাজেই নুড়িপাথর থেকে তুলে নিয়ে নবীন গাছ দু’টোকে মাটিতে বুনে দেয়াটাই তার কাছে ভাল বলে মনে হয়। সেই মতো সে বাসার রান্নাঘর থেকে মাঝারি আকারের একটা হালিমের বাটি খুঁজে বের করে; মাটি ভরে বাটিটায় এবং নবিন গাছ দু’টোকে সে বুনে দেয় সেখানে। বারান্দায় গ্রিল ঘেঁষে বসিয়ে রাখা বিচিত্র সব পাতাবাহারের টবের সাথে মানিপ্ল্যান্টের টবটাকেও তখন বারান্দায় রেখে দেয়া হয়। মাটি, সূর্যের আলো আর পানি পেয়ে মানিপ্ল্যান্ট তখন বাড়তে থাকে দ্রুত।       
প্রায় বছর চল্লিশ ধরে শংকর এলাকার চেয়ারম্যান গলির এই একতলা বাসাটায় শিহাবরা থাকে। শিহাবের আব্বা এবাসাটা কেনার পরে শিহাবরা গেন্ডারিয়ার ডিস্টিলারি রোডের ভাড়া বাসা থেকে এখানে চলে আসে। প্রায় একবিঘা আয়তনের নতুন বাসাটার চারদিকে বিস্তর গাছ লাগায় শিহাবের আম্মা। নারিকেল, আম, মহূয়া, কৃষ্ণচূড়া, মেহগনি, শিরিষ ইত্যাদি। মা’র কল্যাণে বাসার পশ্চিমের সদর দরজার ওপরে লতিয়ে যায় বাগানবিলাস আর মাধবিলতা; দেয়াল থেকে উঁকি দেয় কাঠগোলাপ, মালতি, গন্ধরাজ, কামিনী আর রক্তকরবি। দেয়াল ঘেঁষা মাটিতে শোভা পায় বিচিত্র সব পাতাবাহার, বেলি, জুঁই, টগর, রজনিগন্ধা আর গোলাপ। বর্ষার দিনগুলোতে বৃষ্টির ছাঁটে ভিজে যায় তাদের গাছগুলো। আর বর্ষাকাল বাদে প্রতিদিন বিকালে বা সন্ধ্যায় নিয়ম করে বাগানের এসব গাছে শিহাব আর তার আম্মা মিলে পানি দেয়। বারান্দায় গ্রিল ঘেঁষে মেঝের ওপরে রাখা একগাদা পাতাবাহার এবং মানিপ্ল্যান্টের টবেও পানি দেয়া হয় তখন। এভাবে বাসার আর সব গাছের সাথে টুম্পার দেয়া মানিপ্ল্যান্টের দুটো চাড়াও লহমায় লহমায় বড় হতে থাকে। টুম্পার অবর্তমানে সেই মানিপ্ল্যান্টই টুম্পার প্রতিনিধি হয়ে সর্বদা জেগে থাকে শংকরের বাসাটায়।
একদিন সকালে ঘুম ভাঙার পর বারান্দা থেকে তোয়ালে আনতে গিয়ে শিহাব দেখে, মানিপ্ল্যান্ট আর কয়েকটা ছোটো পাতাবাহারের টব থেকে গাছগুলো গোড়া থেকে ছিঁড়ে ফেলেছে অথবা শেকড়শুদ্ধ উপরে ফেলেছে কেউ। খাবারের খোঁজে রাতের বেলায় ঘুরে বেড়ানো কোনো বিড়াল অথবা বেজিদের কেউ সেই ধ্বংসযজ্ঞ ঘটিয়েছে বলেই তার ধারণা হয়। পাতাবাহারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেখে তার খুব একটা মনখারাপ হয় না কেননা সেই পাতাবাহারগুলোর সহোদরেরা তাদের বাগানে অনেকই আছে। মানিপ্ল্যান্টের একটা চাড়া গোড়া থেকে কাটা পড়েছে দেখে বরং খুব দুঃখ হয় তার কেননা টুম্পার দেয়া মানিপ্ল্যান্টের তিনটা চাড়ার ভেতরে তখন বেঁচে থাকে একটা মাত্র। বিড়াল অথবা বেজির হাত থেকে বেঁচে যাওয়া মানিপ্ল্যান্টের শেষ চাড়াটা আবার হালিমের বাটিটাতে বুনে দেয় শিহাব। তারপর সে বাটিটাকে তারে পেঁচিয়ে ঝুলিয়ে দেয় বারান্দার গ্রিলে যাতে করে বিড়ালটিড়াল আর মানিপ্ল্যান্টটাকে আক্রমণ করতে না-পারে। তখন নির্বিঘেœ নতুন নতুন কুসি ছাড়তে ছাড়তে দীর্ঘ হতে হতে গ্রিল থেকে ঝুলে পড়ে টুম্পার দেয়া ছোটো ছোটো পাতার সেই মানিপ্ল্যান্টটা।  
তার দু’বছর পরের শীতে রাইফলেস পাবলিক স্কুলের বিজ্ঞানের শিক্ষক টুম্পা আর মৃত্তিকাবিজ্ঞানি শিহাব বিয়ে করে। তারা জিগাতলা পোস্ট অফিসের ঠিক উল্টোদিকের একটা ছোটো বাসার দোতলাটা ভাড়া নেয়। এলাকা নির্বাচনের ক্ষেত্রে টুম্পার সুবিধার কথাই বিবেচনা করে শিহাব। জিগাতলা থেকে রাইফলেস পাবলিক স্কুল তো আর দূরে নয়! টুম্পা এবার রিকশায় অথবা হেঁটে খুব সহজেই তার স্কুলে যাতায়াত করতে পারবে। শংকর থেকে কেবল মানিপ্ল্যান্টটাই নতুন বাসায় নিয়ে আসে শিহাব। তার আর সব গাছ রয়ে যায় শংকরের বাসায় আম্মার হাওলায়। পল্লবিত মানিপ্ল্যান্টটাকে টুম্পা ঝুলিয়ে দেয় বারান্দার গ্রিলে। টুম্পা আর শিহাবের যতেœ দিনে দিনে আরো লতিয়ে যায়, গ্রিল থেকে ক্রমশ নিম্নগামী হয় টুম্পার কেনা অপরূপ মানিপ্ল্যান্ট।  
তাছাড়া টুম্পা সেবছরের বর্ষায় শিহাবকে সাথে নিয়ে গিয়ে ধানমন্ডি চার নম্বরের মাঠ ঘেরা নার্সারিটা থেকে একগাদা গাছ কিনে আনতে কয়েক ধরনের পাতাবাহার, বেলি, জুঁই, টগর আর গন্ধরাজ। টবে লাগানো গাছগুলোকে জিগাতলার বাসার বারান্দায় গ্রিলের সাথে বসায় মেয়েটা।
রাইফলেস পাবলিক স্কুল থেকে টুম্পা রিকশায় চেপে বাসায় ফিরে আসে শিহাবের অনেক আগেই বিকাল চারটার পরপর। তারপর একটু বিশ্রাম। আর বিকাল পাঁচটায় খামারবাড়ির অফিস থেকে বের হয়ে একটু হেঁটে কাছের ফামর্গেট থেকে টেম্পু ধরে শিহাব। টেম্পু থেকে জিগাতলায় নেমে ফের হাঁটতে হাঁটতে পোস্ট অফিসের সামনের বাসায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা প্রায় ছয়টা। তারপর তারও একটু বিশ্রাম লাগে। তখন টুম্পার সাথে গল্প করতে করতে শিহাব বিছানায় শুয়ে ঝিমিয়ে যায়। দিনের আলো যখন নিভু নিভু তখন শিহাব চা বানায় এবং টুম্পা আর শিহাব দু’জনে বারান্দার মোড়ায় বসে চা খায়। চা খেয়ে তারা গাছেদের গোড়ায় নিড়ানি চালায়, আগাছা পরিষ্কার করে, সার হিসাবে চা’র পাতা ঢালে কখনো। যেদিনগুলোতে বৃষ্টি হয় না সেদিনগুলোতে মানিপ্ল্যান্ট আর অন্যান্য গাছে তারা দু’জনে পানি দেয়। এভাবে জিগাতলার সেবাসাটায় টুম্পার কেনা মানিপ্ল্যান্ট আরো পল্লবিত হয়, লতিয়ে লতিয়ে গ্রিল বেয়ে নিচে নামতে থাকে দ্রুত আর হালিমের বাটিটায় ক্রমাগত অঙ্কুরিত হতে থাকে মানিপ্ল্যান্টের আরো অনেকগুলো কুসি।    
তার দু’বছরের পরের বর্ষায়, যে বর্ষায় নাবিলের জন্ম হয়, গভীর আর্দ্রতার কারণে আধা সেন্টিমিটার মতো লম্বা ছোটো ছোটো শামুক দেখা দেয় মানিপ্ল্যান্টসহ আরো তিনটা গাছের টবে। একদিন সকালবেলায় চা খেয়ে বারান্দায় গিয়ে শিহাব যথারীতি সিগারেট ধরায় এবং দাঁড়ায় গিয়ে তার প্রিয় মানিপ্ল্যান্টের পাশে। তখন মানিপ্ল্যান্টের টবের মাটিতে আর গাছের কাণ্ডে চুপচাপ বসে থাকে অথবা নড়াচড়া করে ছোটো ছোটো শামুকের দল। তাই দেখে শিহাব আর্তচিৎকার দেয়: আয় হায়! এই পিচ্চি শামুকগুলা তো সব গাছগুছ কাইটা ফালাইব! শিহাবের চিৎকার শুনে দৌড়িয়ে বারান্দায় ছুটে আসে স্কুলে যাওয়ার জন্য তৈরি টুম্পা। তারা জলদি মানিপ্ল্যান্ট আর তিনটা পাতাবাহারের টব থেকে আইসক্রিমের কাঠি দিয়ে শামুকগুলোকে তুলে নিয়ে গ্রিলের বাইরে ফেলে দেয়। তাছাড়া শিহাব টুম্পাকে বলে: ডিমের খোসা ভাইঙ্গা গাছগুলোর ঠিক নিচে মাটির উপরে ছড়াইয়া দেয়া দরকার এখনই। খোসার ধার গায়ে লাগলে পরে শামুকগুলো আর গাছ বাইয়া উপরে উঠতে চাইব না।     
কিংকর্তব্যবিমূঢ় টুম্পা শিহাবকে জিজ্ঞাসা করে: স্নেইল রিপেলেন্ট খুঁজবা নাকি?
শিহাব উত্তর দেয়: টাইম নাই, বুজছ! অফিস থেকে ফিরা আসতে আসতে শামুকগুলা গাছ কাটাকুটি কইরা ফালাইব।
কাজেই তারা ফ্রিজের ভেতর থেকে আগের দিনে কিনে আনা এক ডজন মুরগির ডিম বের করে, ভেঙে, ডিমের খোসা ছোটো ছোটো টুকরা করে ছিটিয়ে রাখে মানিপ্ল্যান্টসহ আর সব গাছের মাটিতে। গাছের গোড়ায় ডিমের খোসা ছিটানো হলেও অফিসে নানা কাজের ভেতরে গাছগুলো নিয়ে শিহাবের টেনশন আর থামে না। তাই সে খামারবাড়ির ভেতরের একটা দোকান থেকে স্নেইল রিপেলেন্ট কিনে আনে এবং বিকালে বাসায় ফিরে সবগুলো টবের মাটিতে সে আর টুম্পা মিলে রিপেলেন্ট স্প্রে করে দেয়। পরের বর্ষাগুলোতে শামুকের আক্রমণের আগেই তারা ডিমের খোসা ছিটিয়ে রাখে টবের গাছগুলোর গোড়ায়। এভাবে কোনো বর্ষাতেই পিচ্চি শামুকেরা আর তাদের বাগানের গাছ কাটতে পারে না।  

টুম্পা আর শিহাবের সেই প্রিয় মানিপ্ল্যান্টটা যুথির অযতেœ মরে গেল! শিহাব সে দুঃখ কোনোমতেই ভুলতে পারে না। সেই হালকা সবুজ পাতা আর হালকা হলুদ ছোপের মানিপ্ল্যান্টটা নাই বলে খুবই ফাঁকা ফাঁকা লাগে তার। কিন্তু গভীর অভিমানে টুম্পাকে শিহাব আর তা বলে না। সেই ফাল্গুনের প্রতিসন্ধ্যায় দিনের আলো নিভে যাওয়ার আগে যথারীতি চা খেতে খেতে টুম্পা আর শিহাব এটা-ওটা নিয়ে গল্প করে। নিয়ম করে গাছগুলোতে পানি দেয় তারা। নাবিল তখন বারান্দায় সাইকেল চালায়। টুম্পা তাকে যথারীতি সাবধান করে: এই সাবধানে সাইকেল চালাইবা কিন্তু! টব-টুব ভাইঙ্গো না আবার! এবং তখন শিহাব লক্ষ করে, গ্রিলের যেখানে মানিপ্ল্যান্টবিহীন টবটা ঝুলছে সেদিকে প্রায়ই তাকিয়ে থাকে অন্যমনস্ক টুম্পা। সোফায় শুয়ে টিভি দেখতে দেখতে অথবা রাতে খাবার টেবিলে বসে অথবা রাত বাড়লে কোনোদিন তারা খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে গেলে টুম্পা শিহাবকে বলে: মানিপ্ল্যান্টটার জন্যে খুব মন খারাপ লাগে, জান! শিহাব ছোট্ট করে উত্তর দেয়: আমারও লাগে। কী আর করবা বল! শিহাব আর কথা বাড়ায় না কেননা কথায় কথায় যুথির দায়িত্বজ্ঞানহীনতার প্রসঙ্গ উঠবেই এবং তখন সে তার জমে থাকা রাগ টুম্পার ওপরে ঝেরে ফেলতেই পারে। নিশ্চয় টুম্পার পছন্দ হবে না সেটা!  
চৈত্রমাসের একরাতে নাবিলকে বাসার দু’নম্বর ঘরে পড়তে বসিয়ে বসার ঘরের সোফায় বসে টিভি দেখে টুম্পা এবং ল্যাপটপ কোলের ওপরে রেখে সে যথারীতি ফেইসবুকে প্রিয়তম বন্ধু যুথির সাথে দীর্ঘক্ষণ ধরে চ্যাট করতে থাকে। গ্যাসের চুলায় খাবার পানি ফুটিয়ে লিভিং রুমের সোফায় গিয়ে বসে শিহাব। টিভির চ্যানেল পাল্টাতে পাল্টাতে নিজের একটা ভুলের কথা তখন মনে পড়ে তার এবং সে টুম্পাকে  বলে: যাহ্! আজকেও বারান্দার লাইটটা কেনা হইল না! কাইলকা রাইতে ফিউস হইল যেইটা।
যুথির সাথে চ্যাটে ব্যাস্ত টুম্পার কোনো উত্তর নাই। শিহাব বিরক্ত হয় এই ভেবে: যেই ছেমরি তর প্রিয় মানিপ্ল্যান্ট মাইরা ফালাইল, তার লগে এত পীরিত কিসের! আর অহন তুই তার লগে চ্যাট করতাছস বইলা কাজের কথাও শুনতে চাস না! একথা বল্লে টুম্পা অবশ্যই বাসায় গজব লাগিয়ে দেবে।  তাই সে অন্যপথে তার জমিয়ে রাখা বিরক্তি ঝাড়ে টুম্পার ওপরে: লাইট কিনার কথা মনে করায় দিলে কী ক্ষতিটা হইত তোমার!
ল্যাপটপ থেকে মুখ না-তুলেই বিরক্তি নিয়ে টুম্পা সেঅভিযোগের উত্তর করে: খামাখা খ্যাচখ্যাচ করতাছ কেন? দেখতাছ না যে যুথির সাথে কথা কইতাছি!
তখনই ল্যাজে পাড়া দিয়ে ঝগড়াটা শুরু করে শিহাব। কন্ঠে তীব্র শ্লেষ নিয়ে সে টুম্পাকে প্রশ্ন করে: মানিপ্ল্যান্ট নিয়া তোমার জানে জিগার বন্ধু যুথি কি বলছে? গাছটা মইরা যাওয়াটা একটা দৈব ঘটনা, ঠিক?
যুথি এসব কিছুই বলে নাই। সে বরং সরি হইছে। ল্যাপটপ থেকে মুখ না-তুলেই বলে খুব-বিরক্ত টুম্পা।
সরি হইলেই সব শ্যাষ হইয়া গেল? মানুষ ক্যামনে এত দায়িত্বজ্ঞানহীন হইতে পারে, আমি ভাবতেই পারতাছি না! আর তুমিই বা কী কইরা যুথির মতো আওলাঝাওলা একজন মাইনষের কাছে গাছে পানি দিয়ার দায়িত্ব দিয়া চিটাগং যাইতে পারলা! তোমার বড় ভাই লেকসার্কাস থিকা আইসা অন্তত একদিন পরপর সব গাছগুলাতে পানি দিয়া যাইতে পারত না?
এভাবে রাগ আর অভিযোগ একসাথে টুম্পার ওপরে ঝাড়ে শিহাব। তখন অপরাধবোধে কার্পেটে চোখ রেখে, গলা নামিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা করে টুম্পা: দেখ, এই গাছটার উপরে আমারও অনেক মায়া। নিজের হাতে আমি গাছটা কিনছিলাম, যতœ কইরা বড়ও করছিলাম! আমিও তোমার মতোই কষ্ট পাইতাছি, দেখতাছ না তুমি? আমার মনে হইছিল যে বড় ভাই যদি পানি দিতে দুই-তিন দিন গ্যাপ দিয়া বসে তা হইলে তো আমার আদরের মানিপ্ল্যান্টটার ক্ষতি হইয়া যাইতে পারে! ও তো খুব ব্যস্ত থাকে, জান। তাই আমি যুথিরে আমাদের গাছগুলায় পানি দিয়া যাইতে বলছিলাম। যুথি আওলাঝাওলা নেচারের হইলেও প্রত্যেক সন্ধ্যায় আমাদের বাসায় আইসা গাছগুলোতে পানি দিয়া যাইব বইলা কথা দিছিল। আমি তো আর বুঝি নাই যে সে কাজটা ঠিক মতো করতে পারবে না!
যুথির তো নিজেরই কোনো ঠিকঠিকানা নাই! অফিস থিকা বাইর হইয়া আড্ডাটাড্ডা মাইরা বাসায় ফিরা গিয়া হয় সে টিভি দেখব না-হইলে ফেইসবুকে ব্যস্ত থাকব আর পাউরুটি খাইব বইসা বইসা! কোনো কাজবাজ করনের টাইম আছে নেকি তার! ভুল করছ তুমি!  
একবাক্যে শিহাবের কথা মেনে নেয় টুম্পা: ভুল যে করছি, তা তো দেখাই যাইতেছে।
রাগের মাথায় তখন বলে ওঠে শিহাব: আমি এইসব বুঝিটুঝি না! যুথিরে বল আমার মানিপ্ল্যান্ট ফিরত দিয়া যাইতে।
তুমি কিন্তু এখন বেশি বেশি করতাছ! মইরা যাওয়া গাছ ক্যামনে ফিরত দিবে যুথি? এই বলে রাগে কাঁপতে থাকে টুম্পা।
সেইটা আমার জানার বিষয় না। শিহাবও তার গনগনে চোখ দেখাতে ছাড়ে না।
কাম পাও না, না? যুথির পিছে লাগছ? গাছটা তো এমনিও মইরা যাইতে পারত! তোমার হাতে মইরা গেলে কারে গাইল দিতা তুমি?
নিজেরে গাইল দিতাম।
দেখা আছে আমার! কত নিজেরে গাইল দিছ তুমি! গাছ মইরা গেছে, তাই নিয়া পড়ছ এখন! আমার স্বপ্নগুলা যে দিনে দিনে মইরা গেল, তার কী করছিলা তুমি?  
এবং তখন টুম্পা তার নিজস্ব স্বপ্নবিপর্যয়ের প্রসঙ্গ তোলে আবারো, অনেকদিন পর।  
টুম্পা আর শিহাবের প্রেমপর্বে শিহাব একবার তার বন্ধুদের সাথে হিমালয়ের পোখারায় বেড়াতে যায়। পূন হিলে উঠে সে ধবলগিরি আর অন্নপূর্ণা রেঞ্জের কয়েকটা ছবি তুলে আনে। ছবিগুলো দেখার পরে টুম্পা শিহাবের সাথে পোখারায় গিয়ে নিজের চোখে ধবলগিরি আর অন্নপূর্ণার সৌন্দর্য দেখতে চেয়েছিল। কিন্তু তারা তাদের স্বল্পবেতন থেকে নেপাল-ভ্রমণের পয়সা বাঁচাতে পারেনি বলে তাদের আর একসাথে নেপাল যাওয়া হয় নাই । টুম্পার সেকষ্টটা রয়েই গেছে। মেয়েটার এমন আরেকটা কষ্ট হ’ল থাইল্যান্ডের  ফিফি আইল্যান্ডে যেতে না-পারাটা।  একবার ইন্টারনেটে সার্ফ করতে করতে লাইম স্টোনে সাজানো ফিফি আইল্যান্ডের কিছু ছবি দেখে সে। মেয়েটা শিহাবকে বলে যে ঠিক এমন একটা নির্জন দ্বীপের সবুজ লেগুনে শুয়ে থাকার ইচ্ছা তার অনেক অনেক দিনের এবং তাই শিহাবের সাথে সে জলদিই ফিফি আইল্যান্ডে বেড়াতে যেতে চায়। পয়সা জমাতে পারেনি বলে তাদের থাইল্যান্ড যাওয়ার পরিকল্পনাটাও ঝুলে আছে দীর্ঘদিন ধরে। আর থেকে থেকেই টুম্পা তুলে বসে তার স্বপ্নবিপর্যয়ের সেসব কথাবার্তা।
তখন বেশির ভাগ সময়ে চুপ করে বসে থাকে শিহাব। আর খুব মেজাজ খারাপ হলে, আজকে যেমনটা হয়, সে টুম্পাকে অভিযুক্ত করে ফেলে: শংকরে থাকলে তো আর বাসাভাড়াটা দিতে হইত না! তুমিই তো তখন বল্লা যে শ্বশুর-শাশুরির সাথে থাকবা না! পয়সা জমবে কই থিকা? শিহাবের সেকথায় কখনো টুম্পা চুপ করে থাকে, কখনো সে মুখ ঝামটিয়ে ওঠে: নিজের অক্ষমতা স্বীকার কর মিয়া! অথবা কখনো টুম্পা বিষাদগ্রস্ত হয়: সবই আমার কপাল! ফিজিক্সে পড়ছি বইলা ভাল একটা চাকরি পাইলাম না তখন। তা না-হইলে কি আর স্কুলে মাস্টারি করতে লাগে! ফিজিক্সে না-পইড়া ফিনান্স পড়াটাই ভাল ছিল! পরস্পরের আর্থিক অক্ষমতাকে আজকেও আবার দায়ী করে টুম্পা। এরকম বিবাদের কোনো একটা পর্যায়ে শিহাব বলে বসে, যেমনটা এখনো হয়: আমার মতো একজন সরকারি চাকরিজীবীরে তোমার বিয়া করাই উচিত হয় নাই! টুম্পা তার বহুল ব্যবহৃত মন্তব্যটা আবারো ছোঁড়ে তখন: ইচ্ছাটাই আসল বুঝলা!   
কিন্তু মানিপ্ল্যান্টের মৃত্যুর সাথে টুম্পার কিছু স্বপ্নের মৃত্যুর তুলনামূলক আলোচনার কোনো প্রাসঙ্গিকতা কিছুতেই খুঁজে পায় না শিহাব। তাই সে টুম্পাকে বলে: তুমি তোমার ভাঙ্গা রেকর্ড বাজাইতে থাক! আমি গেলাম গা! খালি মনে রাইখ, পারটেক্সের আলমারিটা ঝুরঝুর কইরা ভাইঙ্গা পরতাছে! বেতের সোফাটাও ভাইঙ্গা পড়ব যে কোনোদিন! আমাদের মতো অল্প বেতনের পাবলিকের ট্যাকাপয়সা জমে না। হাজারটা ইচ্ছা থাকলেও কোনো লাভ নাই। এই সত্যটা তুমি মানতে পারলা না কোনোদিন!
আরো কিছু হয়ত বলত শিহাব, কিন্তু টুম্পা তখন আবারো তাকে আঘাত করে: তোমার এইসব জ্ঞানের কথা আল্লার ওয়াস্তে বন্ধ কর! তোমার তো কোনো স্বপ্নই নাই!
আহত শিহাব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর বিষণœ কন্ঠে সে উত্তর দেয়: আমার স্বপ্ন আমারই থাক! অল্প বেতন নিয়া আমি যে টিকা আছি, এইডাই আমার কাছে জরুরি!
বেকার একটা ঝগড়ায় এভাবে ইস্তফা দেয় শিহাব। টুম্পার সাথে ঝগড়া করে প্রচণ্ড বিবমিষা জাগে তার এবং তাই বসার ঘরে গিয়ে সোফায় শুয়ে শুয়ে সে টিভি দেখে সারা রাত। সে আর তাদের দু’জনের শোয়ার ঘরে ফিরে যায় না। রাত বাড়ে। কিন্তু টুম্পাও তাকে শুতে ডাকে না। সোফায় শুয়ে টিভি দেখতে দেখতে শিহাব ঘুমিয়ে যায় একসময়।
তারপর শিহাব আর টুম্পার সংঘর্ষের দিনগুলোতে তাদের প্রাত্যহিকতায় বেশ কিছু পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। জিগাতলার সেবাসাতে টুম্পা আর শিহাব কেউ কারো সাথে কথা বলে না। টুম্পা তার মতো করে তাদের দু’জনের প্রথাগত ঘরে থাকে, শিহাব থাকে বাসাটার পশ্চিমের তিন নম্বর ঘরটায়। টুম্পাকে এড়ানোর জন্য টুম্পার অনুপস্থিতিতে শিহাব তার প্রাত্যহিক প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র তিন নম্বর ঘরে এনে রাখে, অফিস করার কাপড়চোপড়, ওয়ালেট, ঘড়ি, মোবাইল, আই ডি কার্ড, আফটার শেভ লোশন, ডিও স্প্রে ইত্যাদি। টুম্পার ওপরে মেজাজখারাপ নিয়ে শিহাব বসার ঘরের সোফায় শুয়ে রাত জেগে টিভি দেখে আর একটু পরপর ফুকফুক করে সিগারেট খায়। রাত্রিজাগরণ এবং চৈত্রমাসের গরমে ক্লান্ত হয়ে কখনো সোফাতেই, কখনো বা সোফা থেকে উঠে গিয়ে বাসার তিন নম্বর ঘরের সিঙ্গেল খাটে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ে সে।
ডাইনিং স্পেসে পানি খেতে গিয়ে শিহাব দেখতে পায়, ঘরের বাতি নিভিয়ে বিছানায় আধশোয়া হয়ে চোখে চশমা লাগিয়ে টুম্পা তার ল্যাপটপে ব্যস্ত। হয়ত ফেইসবুকে, হয়তবা বিভিন্ন অনলাইন সংবাদপত্রে অথবা কবিতার পাতায় চোখ মেলে রাখে টুম্পা। কানে এয়ার ফোন লাগিয়ে কখনো চোখ বন্ধ করে শুয়ে শুয়ে সে গান শোনে। এই দূরে দূরে থাকা অবশ্য তাদের বেলায় নতুন কোনো ঘটনা নয়। অতীতেও ঝগড়াঝাটি করে তারা একই বাসায় আলাদা থেকেছে অনেকবার। নতুন ঘটনা হ’ল পারস্পরিক অসহযোগিতা। যেমন, তারা আর আগের মতো একসাথে রান্না করে না। জিগাতলার বাসাটায় কেবল নাবিলের জন্য খাবার তৈরি করে টুম্পা, নুডলস, স্যুপ, চিকেন নাগেট ইত্যাদি। শিহাব আর টুম্পা যার যার মতো পাউরুটি-কলা চলিয়ে যেতে থাকে। তা’ছাড়া প্রতিদিন সকালের কর্মবিভাজনে ব্যত্যয় ঘটিয়ে নাবিলের স্কুলের পোশাক ইস্ত্রি করে টুম্পা এবং সে নাবিলকে স্কুলের জন্য তৈরি করে নেয়। সচরাচর একাজটা শিহাবই করে থাকে। তবে স্কুলে যাওয়ার আগে নাবিল বাসার তিন নম্বর ঘরে এসে যথারীতি শিহাবের গালে উম্মা দিয়ে যায়। তারপর স্কুলের উদ্দেশ্যে বের হয়ে যায় মা আর ছেলে।
চৈত্রমাসের সেদিনগুলোতে অফিস থেকে ফিরে রোজকার মতো শিহাব নাবিলের সাথে লেগো কোম্পানির ব্লক দিয়ে খেলে আর তাকে স্কুলের হোম ওয়ার্ক করায়। তারপর দমবন্ধ সন্ধ্যায় সে শংকরমোড়ের সিটি কাফে-তে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে যায় প্রতিরাতেই। টুম্পার সাথে সংঘর্ষের আগে সে শংকর যেত একদিন পরপর। এখন চিত্রটা ভিন্ন। সিটি কাফে-তে যাওয়ার আগে সে আব্বা-আম্মার জন্য যথারীতি বাজার করে নিয়ে যায় অথবা ওষুধ কেনে। সিটি কাফের সামনের ফুটপাথে দাঁড়িয়ে চৈত্রমাসের গরমে ঘামতে ঘামতে তারা বন্ধুরা গল্প করে আর চা-সিগারেট খায়। বন্ধুরা কেউ ইন্সিউরেন্স কোম্পানির কর্মকর্তা, কেউ শিক্ষক, কেউবা ব্যর্থ ব্যবসায়ী। যথারীতি তারা স্মরণ করে তাদের স্বপ্নের মেয়েদেরকে। তা’ছাড়া চলমান রাজনীতি নিয়েও তারা আলোচনা করে, বিরক্ত হয় আবার রাজনীতিবিদদের কাণ্ডকীর্তি দেখে তারা কৌতুকে হাসেও। তেমন একদিনে শিহাবের বিষণœতা লক্ষ করে বন্ধুদের ভেতর থেকে প্রথমে তাকে হামলা করে মিলু। মিলু তাকে জিজ্ঞাসা করে, ‘কি রে? তর মামলাটা কী? মুখ কালা কইরা বইসা থাইকা কী লাভ হইতেছে তর?’ তখন বিষণœ শিহাব তার বন্ধুদেরকে প্রিয় মানিপ্ল্যান্টের মৃত্যুর খবরটা জানায়।
হাসতে হাসতে মিলু বলে: দুই সপ্তাহ হইছে তুই টুম্পার লগে গ্যানজাম লাগাইছস! এইরকম মুখ চুন কইরা ঘুইরা না-বেড়াইয়া ঝগড়া মিটাইয়া ফেল গা, যা!  
শিহাব বিস্মিত হয়ে মন্তব্য করে: টুম্পা আর যুথি মিল্লা আমার আদরের মানিপ্ল্যান্টটা মাইরা ফেলছে। আর তুই আমারে টুম্পার লগে মীমাংসা করতে কস!
শিহাবের ওপরে চরম বিরক্তি নিয়ে রহমান বলে: তর না সবকিছু নিয়াই বাড়াবাড়ি! আরে হালা, মানুষ মইরা যাইতাছে, প্রেম মরতাছে, আর তুই এক মানিপ্ল্যান্ট মইরা গেছে বইলা টুম্পার ল্যাঞ্জায় পাড়া দিয়া কাইজ্যা লাগাইলি! যুথি, না কি যেন মাইয়াটার নাম, তার উপরে তুই বিলা হইছস, ভাল। আমি তো টুম্পার কুনু দোষ দেখতাছি না! টুম্পা কি ইচ্ছা কইরা গাছটা মাইরা ফেলতে ওই মাইয়াটার কাছে রাইখা গেছিল নেকি?
টুম্পার পক্ষে কথা বলাতে রহমানের ওপরে মেজাজ খারাপ হয়ে যায় শিহাবের এবং সে কোনো উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করে না।
মামুন বলে: আরেকটা মানিপ্ল্যান্ট জোগাড় কইরা লাগাইতে হাত-পা খইসা যাইতাছে নেকি তর? যা, কাইলই তরে মানিপ্ল্যান্টের একটা চাড়া দিয়া আসুমনে! আমগো বাসার দেয়াল ভইরা ফেলছে মানিপ্ল্যান্ট!
তখন শিহাব আর চুপ থাকতে পারে না। বন্ধুদের সাথে সে ঝগড়াতে প্রবৃত্ত হয়। মামুনের দিকে তাকিয়ে সে বলে: এই গাছটা টুম্পাই আমারে কিনা দিছিল, জানস তুই। তুই হাজারটা মানিপ্ল্যান্ট আনলে পরেও কি