করোনাকাল
বিচ্ছিন্ন অনুভব
মাহফুজা হিলালী

প্রবন্ধ
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান
শামসুজ্জামান খান

গল্প
ডায়মন্ড লেডি ও পাথর মানব
হামিদ কায়সার

গদ্য
নিদ্রা হরণ করেছিল যে বই
মিনার মনসুর

নিবন্ধ
পঞ্চকবির আসর
সায়কা শর্মিন

বিশ্বসাহিত্য
আইজাক আসিমভের সায়েন্স ফিকশন
অনুবাদ: সোহরাব সুমন

বিশেষ রচনা
প্রথম মহাকাব্যনায়ক গিলগামেশ
কামাল রাহমান

শ্রদ্ধাঞ্জলি
মুজিব জন্মশতবর্ষ
মারুফ রায়হান
 
সাক্ষাৎকার
কথাশিল্পী শওকত আলী

জীবনকথা
রাকীব হাসান

ভ্রমণ
ইম্ফলের দিনরাত্রি
হামিদ কায়সার

ইশতিয়াক আলম
শার্লক হোমস মিউজিয়াম

নিউইর্কের দিনলিপি
আহমাদ মাযহার

শিল্পকলা
রঙের সংগীত, মোমোর মাতিস
ইফতেখারুল ইসলাম

বইমেলার কড়চা
কামরুল হাসান

নাজিম হিকমাতের কবিতা
ভাবানুবাদ: খন্দকার ওমর আনোয়ার

উপন্যাস
আলথুসার
মাসরুর আরেফিন

এবং
কবিতা: করেনাদিনের চরণ

১৪ বর্ষ ১১ সংখ্যা
জুন ২০২২

লেখক-সংবাদ :





কী করে নোবেল পুরস্কার মিলবে
ড্যান পাইপেনব্রিং , অনুবাদ : আফসানা বেগম
আজ পাত্রিক মোদিয়ানোর খবরটা পড়তে গিয়ে নোবেল ফাউন্ডেশনের নীরস উদ্ধৃতি দেখে আমি অবাক হলাম, “স্মৃতির মাধুর্যে মানুষের জীবনের সবচেয়ে দুর্লভ পরিণতির কথা তিনি প্রকাশ করেছেন, লেখনীকে সম্পৃক্ত করেছেন জীবন-পৃথিবীর সাথে।” ছোট্ট বর্ণনাটিতে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তাকে তুলে ধরার সব রকম প্রচেষ্টা করা হয়েছে, বইয়ের সামনের পাতায় যেমন একটি জোরালো বর্ণনা থাকে, তীক্ষè দৃষ্টিসম্পন্ন কোনো ঔপন্যাসিক আজকের সময়ের ব্যাখ্যা দেন, অথবা নির্মলভাবে না-বলা কথা বলে যান একজন কবি। (বইয়ের সামনের পাতার কথাগুলো যদি বিশ্বাস করতে চাই তবে বলতে হয়, খুব অল্প কিছু কবিই আজকের দিনে বলার মতো কথা বলছেন।)
এখন ওই উদ্ধৃতিতে ফিরে আসি, আরম্ভ করছি তাদের বলা কথা দিয়ে, “স্মৃতির মাধুর্য,” যে শব্দগুলো আসলে আমার কাছে ততটা শৈল্পিক বলে মনে হয় না। (ব্যাপারটা অনুধাবন করতে গেলে বহু পুরোনো একটা মজার কথা মনে পড়ল : “অপেক্ষা কর, যতদিন তুমি সব ভুলে না যাও!”) স্মৃতিকেই যদি শিল্প হিসেবে ধরি, তবে সেটিই কি সেই শিল্প যার মাধ্যমে মোদিয়ানো “প্রকাশিত” হলেন? প্রকাশিত যদি কিছু দিয়ে হয়েই থাকেন তবে সেটা তো হওয়া উচিত তার লেখা। তিনি যদি কেবল  টেবিলে বসে স্মৃতির সাগরে হাবুডুবু খেতেন, নিজের দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আর কিছুই প্রকাশ করতে পারতেন না। আর এই ব্যাপারে বলতে গেলে-- কেউ কি আসলেই একটি পরিণতি প্রকাশ করতে পারে, তা ছাড়া, প্রকাশিত হয়ে যাবার পরেও পরিণতিটিকে কি আর “দুর্লভ” বলা যায়, খামাখা ভাবা যায় যে সেটি সবচেয়ে দুর্লভ পরিণতি? কে বলতে পারে যে কোন পরিণতির চেয়ে কোন পরিণতির দিকে যাওয়া সহজ? (মনে পড়ে “তার পরিণতি ছিল শিশুদের পায়ের চিকিৎসক হওয়া-- উজ্জ্বল দিবালকের মতো তিনি সেটা দেখতে পেয়েছিলেন।”) এর পরে আছে “জীবন-পৃথিবী” জাতীয় ঝাপসা ধারণা, শুনলে মনে হয় যেন হাইডিগারের (জার্মান দার্শনিক-- অনুবাদক) কথা-- পাশাপাশি দুটো শব্দ না বলে কেবল একটিই বলাই যথেষ্ট হতো না কি? আবার জীবন-পৃথিবীর কথা বলতে গেলে চলে আসে তার বিপরীত শব্দের ভাবনা, যা হতে পারে মৃত-পৃথিবী, যা কিনা অনেক চেষ্টাচরিত্রের পরেও আমাদের সামনে খোলাসা হয়নি।
বসে বসে এরকম উদ্ধৃতি লিখতে যাওয়া নিশ্চয়ই কষ্টের কাজ, সোজা কথায় নিরানন্দ কাজ বলতে যা বোঝায়। অবশ্য এটা অন্ততপক্ষে একজনের কাজ নয়, এক দল মানুষের প্রচেষ্টা; বর্ণনাটিতে “সবচেয়ে” আর “দুর্লভ” কথা দুটি আসার যৌক্তিকতা কতটুকু সেটা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে বিতর্ক চলবার মতো বিষয়। কিন্তু কীসের জন্য বিতর্ক? শেষে যে ফলাফলটি আসবে তা যে কোনো মানুষের জীবনের ব্যাপারেই বলা যেতে পারে; সামগ্রিকভাবে ভাবলে, কেবল যে কোনো লেখকই নন, যে কোনো মানুষ অতীতে স্মৃতি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেছেন, স্মৃতির তলা থেকে বের করে এনেছেন নিজের জন্য পরিণতি আর প্রকাশিত হয়েছেন জীবন ও পৃথিবীর কাছে।
পরস্পরবিরোধী বিষয় নিয়ে কথাবার্তা বলার ব্যাপারে সুইডিশ একাডেমির একশ’ বছরের ইতিহাস আছে-- (লিংক দেখুন http://en.wikipedia.org/wiki/List_of_Nobel_laureates_in_Literature ) বছর বছর তাদের লেখা প্রশংসাগুলো লিপিবদ্ধ করা আছে, আর হতে পারে তারা বর্ণনাটিকে একটি নির্দিষ্ট মানের কাছাকাছি নিয়ে যাবার ক্ষেত্রে খুব সতর্ক, একই ধরনের বিশেষণের ব্যবহার আবশ্যক সেখানে। তবে নিশ্চয়ই তাদের এটা নিয়ে ভাবতে হবে: কারণ প্রতিবারে প্রকাশিত নোটগুলো যদি দেখা যায়, তবে একটি নির্দিষ্ট ধারা বেরিয়ে আসে। নোবেল পুরস্কার পেতে আগ্রহী যে কোনো লেখক সেই নোটগুলো থেকে একটি ধারণা পেয়ে যেতে পারেন আর সেটা হতে পারে তার বিজয়ের পথে গুরুত্বপূর্ণ।
নবীনদের জন্য আদর্শ থাকে, সব জায়গায়। ১৮৯৫ সালে আলফ্রেড নোবেল যখন নোবেল পুরস্কার প্রবর্তন করলেন, তার উইল মোতাবেক দেখা যায় যে, বিচারকগণ এমন একজন লেখককে পুরস্কার দেবেন “যিনি যে কোনো একটি বিষয়ে অভূতপূর্ব কাজ করেছেন”-- যা আসলে একটি অস্পষ্ট শর্ত, বলতে গেলে এমন এক শর্ত যেখা�ধ্যাত্মিক চিন্তাশীলতার স্বীকৃতি হিসেবে।” ১৯১৫ সালে পেলেন রোঁমা রোঁলা “সাহিত্যে উচ্চমানের আদর্শের পুরস্কার স্বরূপ।” তার দু’বছর পরে অ্যাকাডেমি শেষ পর্যন্ত তাদের গৎবাঁধা বাক্য থেকে সামান্য সরে আসতে সমর্থ হলো, কার্ল অ্যাডল্ফকে প্রশংসা করতে গিয়ে বলল, “বিচিত্র এবং সমৃদ্ধ কবিতা গ্রন্থের জন্য, যা তার উচ্চমানের আদর্শেরই প্রতিফলন।” তারা হয়ত কিছুতেই এমন কোনো আদর্শ খুঁজে পান না যা কিনা উচ্চমানের বলা যায় না- অবশ্য আমারও কষ্ট হবে যদি একটি আদর্শের কথা উল্লেখ করতে চাই যা উচ্চমানের নয়।
অ্যাকাডেমি কৃষ্টিকে যথেষ্ট অনুসরণ করে-- বিশেষ করে, যে কোনো কারণেই হোক না কেন, স্প্যানিশ আর রাশান সংস্কৃতির প্রতি তাদের দুর্বলতা আছে। তারা বর্ণনাটি আরম্ভ করে “স্প্যানিশ নাটকের কৃষ্টিকে ধারণ করে,” “স্প্যানিশ নাটকের বর্ণনার আদলে,” “প্রাচীন রাশান সংস্কৃতির অনুকরণে,” “এক এবং অদ্বিতীয় রাশান সাহিত্যের মতো” এবং “স্প্যানিশ কাব্যগ্রন্থের ধারা অনুযায়ী,” অবশ্য সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবার জন্য মাঝে মধ্যে তারা অন্য কোনো সংস্কৃতির কথাও মনে করে থাকে বটে। হয়ত মনে হতে পারে কাজটি বেশ সহজ-- একটি সংস্কৃতির ধারা বেছে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া এবং বাহককে পুরস্কৃত করা। কিন্তু ঠিক তা-ও না, অপেক্ষাকৃত নবীন লেখক নোবেল পেয়ে গেলেন এরই মধ্যে সাত সাতবার।
বহুবার পুরস্কারপ্রাপ্তকে শ্রেষ্ঠ না বলেও বর্ণনা শেষ হয়ে গেছে-- অবশ্য এগারোবার সেটা বলা হয়ে গেছে-- তবে এটা বললেও চলে যে তার লেখা কালজয়ী (এটাও এগারো বার বলা হয়েছে)। আরেকটি শব্দ, সজীব! এই শব্দটি বরাবরই সজীব। লেখকের অনুপ্রেরণাটি হতে হবে নব্য, লেখকের লেখায় থাকবে “কড়কড়ে নতুনের আভাস”-- কোনো আধাখেচড়া সজীবতা নয় কিন্তু দয়া করে!-- একটি “নতুন সৃষ্টির ধারা,” “সজীব এবং সুন্দর কাব্য” যা আমাদের দেয় “নতুন করে বাস্তবতায় প্রবেশের সুযোগ,” “সজীবতায় ঘেরা” ইত্যাদি। লেখক যদি সজীবতার সাথে চলতে না পারেন তবে অন্য কিছু চেষ্টা করা যেতে পারে, যেমন আবেগী (সাতবার বলা হয়েছে) অথবা ওস্তাদ বা দক্ষ কাজে ওস্তাদী (এটাও সাতবার বলা হয়েছে)। এখন কারও মনে প্রশ্ন আসতে পারে অন্য আরও কিছু বিষয়ের ব্যাপারে, তবে মনে রাখতে হবে সত্য শব্দটি (পাঁচবার ব্যবহৃত হয়েছে)। পরিশেষে, লেখা বাস্তব হতে হবে: বাস্তবতা, বাস্তববাদী আর বাস্তবধর্মী, এসব এসেছে নয়বার।
তবে আমি আলোকপাত করব সবচেয়ে সজীব, সবচেয়ে বাস্তব, আর সবচেয়ে ওস্তাদীর ছাপ রাখা বর্ণনাটির ওপরে, সম্ভবত সেটি হলো ১৯৭৪ সালে হ্যারি মার্টিনসনের উদ্দেশে বলা: “এমন লেখা যা ফুলের ওপর থেকে একটি শিশির বিন্দু তুলে তাতে পুরো কসমস ফুলটির ছাপ ফুটিয়ে তোলে।” এটা মোদিয়ানোর ব্যাপারে যা বলা হয়েছে ঠিক ততটাই হাস্যকর, তবে আরেকটু সুন্দর করে বলা হলো এবারে। কসমস এ পর্যন্ত দু’জন লেখককে বর্ণনা করতে ব্যবহৃত হয়েছে, এর অর্থ হলো অ্যাকাডেমির কাছে কসমসের গুরুত্ব কৌতূহল কিংবা প্রধান শব্দগুলোর থেকেও বেশি। আর সে জন্যেই নবীন লেখকদের প্রতি আমার উপদেশ: অত বেশি কৌতূহলী হয়ে কাজ নেই। জগত সম্পর্কে জ্ঞাত (কসমিক) হলেই চলবে।         
(প্যারিস রিভিউ, অক্টোবর ২০১৪)

এই ম্যাগাজিনের কোনো লেখা কোনো অনলাইন বা প্রিন্ট পত্রিকায় প্রকাশ করতে হলে অবশ্যই সম্পাদকের লিখিত অনুমতির প্রয়োজন হবে [email protected]]