করোনাকাল
বিচ্ছিন্ন অনুভব
মাহফুজা হিলালী

প্রবন্ধ
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান
শামসুজ্জামান খান

গল্প
ডায়মন্ড লেডি ও পাথর মানব
হামিদ কায়সার

গদ্য
নিদ্রা হরণ করেছিল যে বই
মিনার মনসুর

নিবন্ধ
পঞ্চকবির আসর
সায়কা শর্মিন

বিশ্বসাহিত্য
আইজাক আসিমভের সায়েন্স ফিকশন
অনুবাদ: সোহরাব সুমন

বিশেষ রচনা
প্রথম মহাকাব্যনায়ক গিলগামেশ
কামাল রাহমান

শ্রদ্ধাঞ্জলি
মুজিব জন্মশতবর্ষ
মারুফ রায়হান
 
সাক্ষাৎকার
কথাশিল্পী শওকত আলী

জীবনকথা
রাকীব হাসান

ভ্রমণ
ইম্ফলের দিনরাত্রি
হামিদ কায়সার

ইশতিয়াক আলম
শার্লক হোমস মিউজিয়াম

নিউইর্কের দিনলিপি
আহমাদ মাযহার

শিল্পকলা
রঙের সংগীত, মোমোর মাতিস
ইফতেখারুল ইসলাম

বইমেলার কড়চা
কামরুল হাসান

নাজিম হিকমাতের কবিতা
ভাবানুবাদ: খন্দকার ওমর আনোয়ার

উপন্যাস
আলথুসার
মাসরুর আরেফিন

এবং
কবিতা: করেনাদিনের চরণ

১৪ বর্ষ সংখ্যা ০৯
এপ্রিল ২০২২

লেখক-সংবাদ :





ইসমাত খানের লেখা বই ও কিছু ভাবনা
ফারহানা শিফা
“এই যে এই মানুষগুলো তাকে এতোটা  ভালবাসে সেটা কি  মনের টান?  নাহ,  তা নয়, ওদের  জন্য সায়লা একটা  আলোর  বিন্দু যা তাদেরকে নিয়ে যাবে আলোকিত  পৃথিবীতে, তাই তারা তাকে হারাতে চায় না, ভালোবাসার অটুট  বাঁধনে  বেঁধে রাখতে চায়। বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস  বেরিয়ে এলো। এ কোন জালে আটকে গেল সে। এ  জাল   ছিঁড়ে  কবে, কিভাবে বেরুবে?”       
অথবা      
“আমীর তার প্রশ্নের  জবাব খুঁজে ফিরেছে অনেক বছর ধরে। কি অপরাধ ছিল তার মায়ের? কি অপরাধই বা ছিল তার? তার বাবার সংসারে কোন মহিলাই তো রাজত্ব করছে, সেটা কেন তার মার ভাগ্যে হল না। একটা স্বাভাবিক জীবন কেন সে পেল না? জবাব খুঁজে পায় নি আমীর কিন্তু প্রশান্তি পেয়েছে। না  পাওয়ার কষ্ট এখন তাকে আর  তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় না। সমাজ সংসারের এই পাওয়া না পাওয়া, পার্থিব এই ভোগ বিলাস বড় বেশি আপেক্ষিক তার কাছে। অনেক বড় পাওয়ার নেশায় সে বুঁদ এখন। ”
 আরেকবার পড়ছিলাম ইসমাত খানের লেখা ‘অবলা’ বইটি । একই বই বারবার পড়ায় নাকি বিষয় আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করা যায়! উল্লেখিত অংশ দুটো নজর কেড়ে নিল। সায়লা এই গল্পের কথক, যার মাধ্যমে কথিত হয়েছে গল্পটি এবং যার উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে গল্পটির বিন্যাস। তবে গল্পের মূল চরিত্র আমির, যার জন্ম পূর্ববর্তী সময় থেকে তার বেড়ে ওঠা এবং দীর্ঘ কাল নিরুদ্দেশ থাকার পর হঠাৎ ফিরে আসা, এই গল্পের চমক।
‘অবলা’ আমাদের বিচিত্র সামাজিক জীবনের শিকার নির্যাতিত কিছু মানুষের গল্প। সামাজিক রীতিনীতি এবং প্রথা অনেক সময় মানুষের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায়। নিয়ম কানুনের বেড়াজালে আটকে থেমে যায় কত মানুষের জীবন। এখনো গ্রাম বাংলার আনাচে কানাচে প্রতিনিয়ত কখনো পিতার, কখনো স্বামীর, কখনো বা শাশুড়ির ইচ্ছের বলি হচ্ছে কত সখিনা, হাসিনারা। মায়ের নির্যাতনের নীরব সাক্ষী রয়েছে কত আমীর। কত আমীরের মত চরিত্র জীবনবিমুখ হয়ে যাপন করে অন্য মাত্রার জীবন ।
আসলে আমরা কম বেশি সবাই আমীর। প্রতিনিয়ত জীবনের জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে জীবনকে জানতে চেষ্টা করি। প্রশ্নের উত্তর খুঁজি। জীবনের হিসেব মেলাই। যখন নিজের ভিতরটাকে জানতে পারি তখন বাইরের সব কিছু আপেক্ষিক আর তুচ্ছ হয়ে যায়।
লেখিকাকে নিজস্ব পরিসরে চিনি বলে কৌতূহল হল নিজের ভাবনা আর লেখিকার ভাবনার মেলবন্ধন  আদৌ আছে কিনা খুঁজে দেখবার। প্রশ্ন করেছিলাম ইসমাত খানকে,  পাশ্চাত্যের জীবন যাপনে দীর্ঘকাল অভ্যস্ত হয়েও তিনি গ্রাম বাংলার এমন বিষয় নিয়ে লিখলেন কেন। কোন বিষয়গুলো তাকে ভাবায় , কাঁদায় এবং লিখতে  উৎসাহিত করে।
উত্তরে জানতে পারলাম, পদ্মার পাড়ে বেড়ে ওঠা ইসমাত গভীর ভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন তাঁর গল্পের চরিত্রগুলো। মনগড়া, সম্পূর্ণ কাল্পনিক এরা নন। যদিওবা গল্পের ছন্দবদ্ধতায়  এদের পারস্পারিক সম্পর্ক কিংবা সময়ের হিসেব অনেকটাই লেখিকার স্বেচ্ছাধীন। তবে তার লেখা, কোন ঐতিহাসিক প্রামাণ্য দলিল নয় । সম্পূর্ণই গল্প বিশেষ ।
অবলা গল্পের মুলচরিত্র আমিরের মাকে দেখা যায় খুব সনাতন “বেবি ব্লু” যাকে ইংরেজিতে মেডিকেলের ভাষায় বলা হয় Postpartum depression (PPD) এ ভুগতে । গর্ভ পরবর্তী অবস্থায় প্রায় ৮০% নারী এই মানসিক বিপর্যস্ততার শিকার হন।  
শিশুর জন্মের দু’মাসের মধ্যে যে কোন সময় মা এ রোগে আক্রান্ত হতে পারেন।
লক্ষণগুলো হতে পারে...
( অতিবিরক্তি কিংবা অতি অনুভুতি ) Irritability or hypersensitivity
(মনযোগের  অভাব) Difficulty concentrating
( চিত্ত বিহবলতা ) Anxiety and worry
( অকারণে চোখে পানি আসা কিংবা কান্নাকাটি করা ) Crying or tearfulness
( রাগান্বিত হওয়া ) Anger
( নেতিবাচক অনুভূতি যেমন অকারণ দুঃখ, আশাহত হওয়া, উপায়ন্তর খুজে না পাওয়া , কিংবা দোষী বোধ করা ) Negative feelings such as sadness, hopelessness, helplessness, or guilt
( প্রাত্যহিক কাজে আনন্দ হারিয়ে ফেলা ) Loss of interest in activities you usually enjoy
( ঘুমের ব্যাঘাত , মূলত ঘুম ভেঙ্গে গেলে পুনরায় ঘুম না আসা ) Difficulty sleeping (especially returning to sleep)
( অযথাই দুর্বল বা হয়রান লাগা ) Fatigue or exhaustion
( খাদ্য রুচিতে পরিবর্তন ) Changes in appetite or eating habits
( মাথাব্যথা , পেটব্যথা, শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ এবং মেরুদণ্ডে ব্যথা ) Headaches, stomachaches, muscle or backaches
এছাড়াও কিছু কিছু সময়ে PPD আক্রান্ত মহিলারা মনে করেন তারা নিজের সন্তানের পরিচর্যা করতে অক্ষম ।
      নানা রকম লক্ষণের মধ্যে হতাশায় আক্রান্ত মা নিজের অবস্থার জন্য অনেকসময় শিশুটিকেই দায়ী মনে করে। এ সময় একমাত্র  পরিবারের সবার সহযোগিতাই মাকে সুস্থ এবং স্বাভাবিক  জীবনে ফিরিয়ে নিতে পারে। কিন্তু বাংলার গ্রামে গঞ্জে অল্প শিক্ষিত লোকেরা ধর্ম, ভূত প্রেত আর প্রথাগত কুসংস্কারের কারনে সহযোগিতা বা সহমর্মিতা দূরে থাক, PPD আক্রান্ত নারীকে পাগল বলে সমাজের স্বাভাবিক জীবন যাপন থেকে দূর করে দেয়।
     নারীর ভালবাসা আর সেবা সবাই দাবি করে কিন্তু তাকে ভালবাসা আর সেবা দিয়ে বাচিঁয়ে রাখবার অঙ্গীকার থেকে সবাই বিচ্যুত হয়ে যায় । এতে করে শুধু একক নারী নয়, আমীরের মত বহু সন্তান আর তার পরিবারও গভীরভাবে ক্ষত বিক্ষত হয়। এমন হাজারো কারণ ইসমাতকে প্রতিনিয়ত   তোলপাড় করে, ফিরে ফিরে নিয়ে যায় নিজস্ব ছেলেবেলায় দেখা মানুষগুলোর জীবন উপাখ্যানে ।
    লেখক ইসমাত গত তিন বছরে পাঁচটি বই প্রকাশ করেছেন। তাঁর প্রথম বইয়ের নাম ‘বিবর্ণ ভালবাসা’ প্রকাশিত হয়েছে ২০১২ সালের বই মেলায়। দ্বিতীয় বই ‘অবলা’ তে তিনি সামাজিক দায়বোধ থেকে দক্ষতার সাথে আলোকপাত করেছেন, বহু সনাতন এবং উপেক্ষিত বিষয়বস্ত, যা আজও বিরাজমান বাংলার ঘরে ঘরে।
     তাঁর ‘অবলা’ বইটির প্রতিটি চরিত্র তিনি এতো সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন যে তা খুব সহজেই পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। কোন লেখকের কষ্টের গল্প যদি পাঠকের চোখে পানি এনে দেয় তবে নাকি সে সার্থক লেখক। এদিক দিয়ে ইসমাত আরেফিন খান একশত ভাগ সার্থক। তাঁর ‘অবলা’ পাঠককে কাঁদিয়েছে। এই বইটি ২০১৩ সালে প্রকাশ করেছে ইছামতী প্রকাশনী। পাঠকের ব্যাপক আগ্রহে আবারও বইটি পুনর্মুদ্রণের কাজ চলছে।