করোনাকাল
বিচ্ছিন্ন অনুভব
মাহফুজা হিলালী

প্রবন্ধ
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান
শামসুজ্জামান খান

গল্প
ডায়মন্ড লেডি ও পাথর মানব
হামিদ কায়সার

গদ্য
নিদ্রা হরণ করেছিল যে বই
মিনার মনসুর

নিবন্ধ
পঞ্চকবির আসর
সায়কা শর্মিন

বিশ্বসাহিত্য
আইজাক আসিমভের সায়েন্স ফিকশন
অনুবাদ: সোহরাব সুমন

বিশেষ রচনা
প্রথম মহাকাব্যনায়ক গিলগামেশ
কামাল রাহমান

শ্রদ্ধাঞ্জলি
মুজিব জন্মশতবর্ষ
মারুফ রায়হান
 
সাক্ষাৎকার
কথাশিল্পী শওকত আলী

জীবনকথা
রাকীব হাসান

ভ্রমণ
ইম্ফলের দিনরাত্রি
হামিদ কায়সার

ইশতিয়াক আলম
শার্লক হোমস মিউজিয়াম

নিউইর্কের দিনলিপি
আহমাদ মাযহার

শিল্পকলা
রঙের সংগীত, মোমোর মাতিস
ইফতেখারুল ইসলাম

বইমেলার কড়চা
কামরুল হাসান

নাজিম হিকমাতের কবিতা
ভাবানুবাদ: খন্দকার ওমর আনোয়ার

উপন্যাস
আলথুসার
মাসরুর আরেফিন

এবং
কবিতা: করেনাদিনের চরণ

১৪ বর্ষ ১১ সংখ্যা
জুন ২০২২

লেখক-সংবাদ :





প্রাকৃতিক জ্ঞান ও খনার বচন
নারী ও প্রকৃতি
ঝর্না রহমান
বিপন্ন প্রকৃতি: এক অর্থে নারী আর প্রকৃতি সমার্থক। স্রষ্টাকে আমরা চোখে দেখি না। তাঁর সৃষ্ট প্রকৃতির অজস্র উপচারের মধ্য দিয়ে তাঁকে উপলব্ধি করি। প্রকৃতি সৃষ্টিশীল, গতিময় আর সুন্দর। প্রকৃতি জীবনেরও উৎস। তাই স্রষ্টা বলতে আমরা আকাশ বাতাস জল মাটি আগুন - এই পঞ্চভূতে বিরাজিত প্রকৃতিকেই বুঝি। আরও গভীর করে ভাবলে বুঝি - প্রকৃতিই স্রষ্টা। নারীও তেমনি প্রকৃতিস্বরূপা। নারীও স্রষ্টা। নারীর মধ্যে জীবনের রস আলো হাওয়া সব একত্রে সন্নিবেশিত। সৃষ্টি সৌন্দর্য ও কল্যাণ - নারীর মধ্যে আছে এই তিনের সমন্বয় - যা প্রকৃতিরও মূল শক্তি।
মানুষ প্রকৃতির অংশ। অথচ মানুষেরই জন্য প্রকৃতি আজ বিপন্ন। সভ্যতার আগ্রাসনের পাশাপাশি মানুষের লোভ স্বেচ্ছাচারিতা আর অবিবেচনার কারণে ক্রমাগত ধ্বংস হচ্ছে প্রকৃতি। ফলে বিশ্বপরিবেশ আজ হুমকির সম্মুখীন। পরিবেশকে রক্ষা করতে হলে বাঁচাতে হবে প্রকৃতি। রুখতে হবে প্রকৃতির সংহার। প্রাকৃতিক সম্পদের ভারসাম্য রক্ষা  করার পাশাপাশি প্রকৃতির স্বাভাবিক বিকাশকেও অব্যাহত রাখতে হবে।
প্রথিবীর সচেতন মানুষ আজ পরিবেশের বিপন্নতা নিয়ে উদ্বিগ্ন। বিজ্ঞানের অকল্পনীয় প্রসারের কারণে বিশ্বের প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর প্রতি মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়েছে বিষ বাষ্প আর নিরন্তর চলেছে ধ্বংসের কুঠারাঘাত। এ অবস্থা থেকে কীভাবে প্রকৃতিকে রক্ষা করা যায় তা নিয়ে চলছে নানারকম চিন্তাভাবনা। পরিবেশ রক্ষা সম্মেলন, আইন, চুক্তি, মতবিনিময়, গবেষণা Ñ কত কিছুই হচ্ছে। কিন্তু তাতে প্রকৃতির ওপর মানুষের অত্যাচার থেমে থাকছে না। সবুজ বনানীর বুকে আছড়ে পড়ছে ঘাতক কুড়াল, নদীর জলে মিশে যাচ্ছে রাসায়নিক বর্জ্য, বাতাসে বিষাক্ত কার্বন। পুড়ে যাচ্ছে মাটি, শুকিয়ে যাচ্ছে ঘাস, ভেঙে যাচ্ছে ঋতুচক্র, ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। বিপন্ন আজ পৃথিবী। বিপন্ন পৃথিবীর মানুষ ও অন্যান্য প্রাণী। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারলে পৃথিবীতে নেমে আসবে বিপর্যয়। তাতে হয় তো মানব সভ্যতা অচিরেই ধ্বংস হয়ে যাবে।
প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার সাথে আমরা কীভাবে নারীকে সম্পর্কায়িত করতে পারি? নারী কি হতে পারে মুমূর্ষু প্রকৃতির শুশ্রƒষাকারিনী? সুস্থতার সবুজ আলো হাতে নারী কি দাঁড়াতে পারে প্রকৃতির পাশে?

নারী ও প্রকৃতি: সভ্যতার উষালগ্নে বিশৃঙ্খল অরণ্য প্রকৃতিতে যখন মানুষের বসবাস সূচিত হয়েছিল Ñ তখন নারীই প্রকৃতিকে দিয়েছিল সুশৃঙ্খল রূপ। আদি নারী ইভ প্রকৃতির প্রতি অসীম কৌতূহল বশত গিয়েছিল স্বর্গের বাগানে, খেয়েছিল নিষিদ্ধ গন্ধম ফল। আর সেই অপরাধের শাস্তি হিসেবে নারীকে নিক্ষিপ্ত করা হলো পৃথিবীর মহা প্রতিকূল অরণ্যপ্রকৃতিতে। গাছের পাতা আর বাকলে নিজের দেহকে আবৃত করে নারীই প্রথম প্রকৃতিকে মানুষের দোসর করে নেয়। সভ্যতার বিকাশের পর্যায়গুলো লক্ষ করলে দেখা যায় মানুষের জীবনের সাথে প্রকৃতিকে সংশ্লিষ্ট করে মানুষের যে প্রতিদিনের জীবন Ñতাকে রূপে রসে বর্ণে গন্ধে ছন্দে গীতিতে এক অপরূপ ঐকতানে বেঁধেছে নারী। আদিম সমাজ ব্যবস্থায় পুরুষ যখন অরণ্য পর্বতে নদীসমূদ্রে বন্যজন্তু ও মৎস্য শিকারে গিয়েছে তখন নারী আবিষ্কার করেছে প্রকৃতির ফলফুলের বদান্যতাকে। আদিম কৃষিব্যবস্থা গড়ে উঠেছিলো নারীরই হাতে। সন্তানের জননীরূপে নারী একদিকে গড়ে তুলেছে মানব সমাজ অপর দিকে প্রকৃতির সাথে জীবনের অবশ্যম্ভাবী যোগসূত্রও সৃষ্টি করেছে। তাই প্রাচীন কাল থেকে বিভিন্ন ধর্মে নারীকে দেখা হয়েছে সৃষ্টি ও সমৃদ্ধির ঈশ্বর বা দেবী হিসেবে। আদি নারী ঈভ পৃথিবীর নারীজাতির প্রতিনিধি হয়ে প্রকৃতির প্রতি মানুষের আগ্রহ ও কৌতূহলকে জাগিয়ে তুলেছিলেন। সনাতন হিন্দু ধর্মের দেবী দুর্গাকে মনে করা হয় প্রকৃতির ঈশ্বরী। তিনি শক্তি, বিদ্যা, বুদ্ধি, জ্ঞানরূপে সর্বভূতে [প্রকৃতিতে ] বিরাজিত। বৈদিক শ্লোকের কয়েকটি পঙ্ক্তিতে দেবী দুর্গার প্রতি প্রকৃতির প্রতিটি অংশকে মানবজীবনের জন্য কল্যাণকর করে তোলার জন্য বন্দনা গাওয়া হয়েছে।    
‘মধুবাতা ঋতায়তে মধুক্ষরন্তী সিন্ধবঃ (ঋতুর বাতাসসমূহ মধুময় হোক, সাগরের জল মধুময় হোক )
মাধ্বী নঃ সন্তোষদ্ধী ( আমাদের ওষধি বৃক্ষসমূহ মধুময় হোক )
মধু নক্তমুতোষতো মধুবৎ পার্থিবং রজঃ ( রাত এবং প্রভাত মধুময় হোক, পৃথিবীর ধূলিরাজি মধুময় হোক)
জীবনের জন্য অবধারিত সমস্ত শক্তি Ñ যেমন ধন, ধান, বিদ্যা, শিল্প ইত্যাদির দেবীরূপে নারীকেই অর্চনা  করা হয়। গ্রীক মিথের ভেনাস আর আফ্রোদিতে হচ্ছেন প্রকৃতির সাথে মানুষের জীবনকে সম্পদে সম্মানে প্রেমে বীর্যে গৌরবময় করে তোলার শক্তিরূপিণী দেবী। তাই সমুদ্রের ফেনার ভেতর থেকে সাগরের নুন আর জলের গন্ধ গায়ে মেখে তার উদয় হয়। আফ্রেদিতের হাতে থাকে প্রেমের প্রতীক আপেল। জীবনের শক্তি ও আনন্দের সাথে আদিকাল থেকেই নারী আর প্রকৃতির এক অবিচ্ছেদ্য যোগসূত্রতা রয়েছে Ñ এই সব শক্তিময়ী দেবী তারই প্রতীক।

লোকায়ত বাংলার নারী: প্রাকৃতিক রূপবৈচিত্র্যের লীলাভূমি বাংলাদেশের জনজীবনে প্রকৃতির ভূমিকা অত্যন্ত ব্যাপক। আদি পৃথিবীর জীবনব্যবস্থা সুমসমন্বিত হয়েছিলো কৃষিব্যবস্থার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের জনজীবনে এই আদিশক্তি কৃষিই মূল চালিকা শক্তি। এ দেশের ভূগোল লক্ষ গ্রামেরই সীমারেখায় বিস্তৃত। গ্রামজীবনের দৈনন্দিনতার সাথে, কৃষিকাজের সামগ্রিকতার সাথে গ্রামীণ নারীর সংশ্লিষ্টতা সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। গ্রামীণ মেয়ে প্রকৃতিরই কন্যা। শ্রমে ঘামে মমতায় স্নেহে নান্দনিক শিল্পচেতনায় আর সহজ সরল সৌন্দর্যবোধে গ্রামের নারীই প্রতিদিনের জীবনকে নির্মাণ করে। এই নির্মাণকাজে নারীর সার্বক্ষণিক সহচর প্রকৃতি।  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর কাব্যে বহু জায়গায় নারীকে কোথাও প্রকৃতির কন্যারূপে আবার কোথাও বা স্বয়ং প্রকৃতিরূপেই ( চণ্ডালিকা ) অভিহিত করেছেন। তাঁর একটি গানে রয়েছেÑ
আমি তোমারই মাটির কন্যা জননী বসুন্ধরা
তবে আমার মানব জন্ম কেন বঞ্চিত করা।
লোকজীবনের সাথে প্রকৃতি এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে বাঁধা। আর প্রকৃতির নানা রূপরঙ, ঋতু বৈচিত্র্য, গ্রামনারীদের যাপিত জীবনের প্রতিমুহূর্তের আশা আকাক্সক্ষা প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি দুঃখ বেদনার সাথে এক হয়ে মিশে থাকে। তার ভেতর দিয়ে নারী দেখে তার আপন সত্তাকেই। ভোরের পাখিদের সাথে ঘুম ভাঙে গ্রামনারীদের। তারপর সারদিন ধরে চলে তার সংসার যাপন। এই দিনযাপনে নারীর সুখদুঃখ আনন্দবেদনার দোসর হয় প্রকৃতি।
গ্রামীণ নারী কৃষি নারী। শস্য বীজ সংরক্ষণ, বীজতলা তৈরী, ফসলের জমি তৈরী, ফসল মাড়াই ঝাড়াই থেকে শুরু করে কৃষির প্রতিটি পর্যায়ে গ্রামীণ নারী যুক্ত থাকে। পুরুষের শ্রম আর পরিকল্পনার সাথে নারীর শ্রম যতœ আর মেধা মিলে প্রাচীন কাল থেকে গড়ে উঠেছে আমাদের কৃষিপ্রধান গ্রামজীবনের সংস্কৃতি।
তাই আমাদের লোকসাহিত্যের একটা বড় অংশ নারী জীবনের দুঃখসুখের গাথা। প্রবাদপ্রবচন, ছড়া, বারোমাসী, পাঁচালী, গাথা গীতিকা ইত্যাদি আঙ্গিকে নারীর গভীর অনুভূতি, তার জ্ঞান মেধা আর অভিজ্ঞতার সারাৎসার আর জীবনবোধ আমাদের লোকসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে তুলেছে। দেখা যায় নারীমনের এইসব অনুভূতি আর চেতনা প্রকৃতির আশ্রয়ে শব্দে বাক্যে ছন্দে গীতে তুলনা উপমায় প্রাণ পেয়েছে।
প্রবাদপ্রবচনগুলো বাংলা লোক সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। প্রাচীন বাংলার জ্যোতির্বিদ ডাক বিদূষী নারী খনা ও অজ্ঞাত স্বশিক্ষিত পল্লীজনের অভিজ্ঞতার সারাৎসারবাণী স্বরূপ প্রবচনগুলোর মধ্যে প্রকৃতির নিয়ম শৃঙ্খলা আবর্তন বিবর্তন আর শ্বাশত বৈশিষ্ট্যের যে জ্ঞানের প্রকাশ ঘটেছে তা আমাদের ভাষার অন্যতম মূল্যবান সম্ভার।

ভূয়োদর্শী নারী খনা ও খনার বচন: এ সব প্রবচনের মধ্যে খনার বচনগুলো সংহত জ্ঞানের প্রকাশে ভাষার সরলতায়, সহজ ছন্দদোলায়, আর চিরচেনা জীবনের ছবিতে অনবদ্য হয়ে আছে। এই খনা ছিলেন একজন বিদূষী নারী। প্রাচীন বাংলার এক সহজিয়া কবি। প্রাচীন বিক্রমপুরের রাজা বিক্রমাদিত্যের ( মতান্তরে প্রাচীন অবন্তী রাজ্যের রাজা হর্ষ বিক্রমাদিত্যের) রাজসভার জ্যোতির্বিদ বরাহের পুত্রবধূ খনা ( আনুমানিক কাল: ৭ম থেকে ১২শ শতাব্দী ) ছিলেন অসাধারণ ভূয়োদর্শী নারী। বিশেষ করে চাষবাস গাছপালা আর ফুলফসলের প্রাকৃতিক নিয়ম, সূত্র, বৈশিষ্ট্য, লক্ষণ, ধরন Ñ এসব খনা খুব ভালো বুঝতে পারতেন। কৃষিনারী খনা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন না। স্বামীর সাথে তিনি জ্যোতির্বিদ্যা চর্চা করেছেন তবে তিনি ছিলেন অসাধারণ মেধা আর বুদ্ধিমত্তার অধিকারী। প্রকৃতির জ্ঞানকে তিনি নিজের মানসে ধারণ করেছেন। প্রকৃতিকে দেখেছেন বিজ্ঞানীর চোখে, দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে, দিনরাত্রির প্রতিটি মুহূর্তে প্রকৃতির আচরণকে তিনি লক্ষ করেছেন জ্যোতির্বিদের অনুসন্ধিৎসায়। আবিষ্কার করেছেন জীবন ও প্রকৃতির পারস্পরিক সম্পর্ক। প্রতিদিনের কাজের সাথে সাথে প্রকৃতি থেকে সঞ্চয় করেছেন অসাধারণ অভিজ্ঞতা। সে সব অভিজ্ঞতারই সারাৎসার ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁর কথায়। তাঁর মুখে মুখে রচিত ছন্দোবদ্ধ ছোট ছোট পঙক্তিমালায়। সূর্যের আলোর উত্তাপ, বাতাসের বেগ মেঘের ঘনঘটা, বৃষ্টি পানি নদীর স্রোতধারা, পলিমাটির বৈশিষ্ট্য, গাছের বৃদ্ধি, পাতার রঙ, ফুলফসলের ঘ্রাণ, পাখপাালির ডাক সব কিছুকে খনা অনুবাদ করেছেন অসাধারণ সহজ মনোগ্রাহী ভাষায়।
ফুলফসলের চাষ-আবাদ, খরা-বন্যা মেঘ-বৃষ্টি গ্রহনক্ষত্র ইত্যাদি সম্পর্কে ছন্দোময় পঙ্ক্তিমালায় যে সব বিজ্ঞানসম্মত ভবিষ্যৎবাণী করেন সেসব বাংলা ভাষায় খনার বচন নামে পরিচিত। হাজার বছরেরও বেশি প্রাচীন এই সব ছন্দকথার কোনো লিখিত রূপ নেই। সবই মুখে মুখে প্রচলিত হয়ে কালের সিড়ি বেয়ে বর্তমান যুগ পর্যন্ত চলে এসেছে। লিখিত রূপ না থাকাতে খনার বচনগুলো অধিকাংশই বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছে, তবে যেসব বচন লৌকিক জীবনযাপন গাছপালা ফলফলাদি শাকসবজি ও কৃষিকাজের সাথে সম্পর্কিত সেগুলো আজও সগৌরবে বেঁচে আছে। বাংলার কৃষক সামজে প্রাচীন কাল থেকেই খনার বচনগুলো লাগসই ভবিষ্যৎবাণী হিসেবে সমাদৃত হয়ে আসছে। ধান কাউন আখ কলাই আদা রসুন হলুদ মরিচ সরিষা পান ইত্যাদি ফসল, আম কাঁঠাল সুপারি তেঁতুল কলা নারকেল বেল তাল ইত্যাদি ফল, মূলা পটল কুমড়া গিমা নালিতা পুঁই ইত্যাদি শাকসবজি নিয়ে খনার অনেক বচন রয়েছে যেসবের ভেতর দিয়ে শুধু খনার অভিজ্ঞতার সারাৎসার আর বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানই প্রকাশ পায়নি তার চেয়েও বেশি প্রকাশ পেয়েছে প্রকৃতির প্রতি তাঁর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা। প্রকৃতিকে ভালো না বাসলে প্রকৃতির বৈশিষ্ট্যগুলো এভাবে জানা সম্ভব হয় না। খনা ছিলেন সেই প্রকৃতিকন্যা।  

মেঘবৃষ্টির বচন: আকাশবাতাস নদনদী মেঘবৃষ্টি জলমাটি আলোছায়া যা আমাদের জীবনের প্রতি মুহূর্ত ঘিরে থাকে Ñ আমাদের বেঁচে থাকার নিয়ামক হিসেবে যা কাজ করে Ñ এ সবই কৃষিপ্রধান বাংলার সাথে আবহমান কাল ধরে সম্পৃক্ত। এ দেশের চাষবাস প্রকৃতির ওপর প্রায় সম্পূর্ণতই নির্ভরশীল। জমি তৈরির জন্য উপযুক্ত সময়ে বৃষ্টি দরকার।  তা না হলে বিপদ। আবার ফসল বোনার পর দীর্ঘদিন অনাবৃষ্টি হলেও চাষীর মাথায় হাত। খনার অনেক বচনে মেঘবৃষ্টির লক্ষণ, বৈশিষ্ট্য, বাতাসের বেগ, বাতাসের দিক নির্ণয় এমন সুনির্দিষ্টভাবে করা আছে যে ওইসব বচনকে অনায়াসে প্রাকৃতবিজ্ঞান হিসেবে অভিহিত করা যায়। প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা, প্রকৃতির রহস্য আর শক্তিকে আবিষ্কার করার কৌতূহল আর একনিষ্ঠতা না থাকলে প্রকৃতির বৈশিষ্ট্যকে এভাবে সূত্রায়িত করা যায় না। কয়েকটি প্রবাদ এখানে উদ্ধৃত করছি যেগুলোকে আমরা খনার আকাশ মাটি সম্পর্কিত অসাধারণ ভূয়োদর্শন [ অভিজ্ঞতাজাত জ্ঞান ] বলতে পারি।
১.
কী করো শ্বশুর লেখাজোখা
মেঘেই বুঝবে জলের রেখা
কোদালে কুড়–লে মেঘের গা
মধ্যে মধ্যে দিচ্ছে বা
কৃষককে বলোগে বাধতে আল
আজ না হলেও হবে কাল।
খনার শ্বশুর বরাহ ছিলেন বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ। একবার  চাষের পর বহুদিন বৃষ্টি হচ্ছিল না। বরাহ তখন গণনায় বসেলেন কবে বৃষ্টি হবে। খনা আকাশে মেঘের চেহারা দেখে বলে দিয়েছিলেনÑ আকাশে যখন চাকাচাকা মেঘে দেখা যায় আর পুবে পশ্চিমে ঘন ঘন বাতাসের বেগ দেখা যায় তখন বোঝা যায় আজ না হোক কাল নিশ্চয়ই বৃষ্টি হবে। কাজেই তার শ্বশুর যেন কৃষককে বলেন জলদি জমিতে পানি ধরে রাখার জন্য তারা যেন আল বাঁধে।
সময়ের বৃষ্টি চাষের জন্য যেমন আশীর্বাদ তেমনি অসময়ের বৃষ্টি জনজীবনে তা অভিশাপ হয়ে দেখা দেয়। প্রকৃতি তো এভাবেই আমাদের জীবনের সুখদুঃখের সাথে জড়িয়ে থাকে। নিচের বচনটিতে খনার এই অভিজ্ঞতার জ্ঞান অসাধারণ কাব্যসৌন্দর্য নিয়ে বিদ্যমান।
২.যদি নামে আগনে রাজা নামে মাগনে
যদি বর্ষে মাঘের শেষ ধন্য রাজা পুণ্য দেশ
হৈমন্তিক বৃষ্টি পাকা ধানের জন্য ক্ষতিকর। আর শেষ শীতের বৃষ্টি রবিশস্যের জন্য আর ফলের মুকুল পুষ্ট হওয়ার জন্য উপকারী। অগ্রহায়ণের বৃষ্টি শস্যের ক্ষতি করবে ফলে রাজাকেও ভিক্ষা মাগতে হয়, আর মাঘের বৃষ্টি ফলমূল-ফসলের জন্য আশীর্বাদ তখন দেশের রাজার জয়জয়কার হয়।
অসময়ের কুয়াশা আর অতিবৃষ্টিও দেশের ফুলফসলের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। খনা তার বচনে বলেন
৩.চৈতে কুয়ো ভাদ্রে বাণ,
নরের মুণ্ড গড়াগড়ি যান।
এর মানে হচ্ছে চৈত্র মাসের কুয়াশা আর ভাদ্র মাসের বন্যা ফসলের এত ক্ষতি করে যে দেশে খাদ্যাভাব দেখা দেয়, মানুষ মারা যায়।
খনা কি নিবিড়ভাবে প্রকৃতিকে পর্যবেক্ষণ করেছেন প্রকৃতির লক্ষণগুরোকে বিচার করে আবিষ্কার করেচেন তার ফলাফল।
বৃষ্টির লক্ষণ আর ফসলের ক্ষেত্রে বৃষ্টির প্রভাব নিয়ে আরও কটি প্রবচন লক্ষ করা যায়।
৪. গাছে গাছে আগুন জ্বলে,
বৃষ্টি হবে খনায় বলে।
[গোধূলির আলো উজ্জ্বল লাল হলে যখন মনে হয় গাছের মাথায় আগুন জ্বলে উঠেছে তাহলে শিগগিরই বৃষ্টি হবে বলে মনে করতে হবে।)
৫. জ্যৈষ্ঠে খরা আষাঢ়ে ভরা,
শস্যের ভার সহে না ধরা।
( যদি জ্যৈষ্ঠে রোদ থাকে আর আষাঢ়ে বৃষ্টি হয় তবে এত ভালো  ফসল হয় যে মাটি তার ভার বইতে পারে না। )
৬. বেঙ ডাকে ঘন ঘন,
শীঘ্র বৃষ্টি হবে জানো।
( যদি ঘন ঘন ব্যাঙ ডাকে তবে বোঝা যায় শিগগিরই বৃষ্টি হবে। )

গাছপালা ও খনার বচন: প্রকৃতিকে যদি তুমি ভালোবাসো তবে প্রকৃতি তার জ্ঞানের বিশাল গ্রন্থের পাতাগুলো এক এক করে মেলে ধরবে তোমার সামনে। সেটা পাঠ করে তুমি পেতে পারো জীবনের জন্য কত মূল্যবান জ্ঞান। খনার বচনগুলো বিশ্লেষণ করলে আমরা প্রকৃতির প্রতি তাঁর এই মনোভাবটিরই পরিচয় পাবো। খনা শুধু কৃষিনারীই ছিলেন না, ছিলেন কৃষিবিশারদ। কোন গাছের জন্য কোন পদ্ধতি উপযুক্ত, কোন ফসলের জন্য মাটিতে কতবার চাষ দিতে হবে, ফলফলাদির গাছপালা কী নিয়মে লাগালে ভালো ফলন হবে খনা তার নিয়ম বলে গেছেন অনেক সহজ ছন্দোময় প্রবচনে। আমাদের গ্রামীণ জীবনে এইসব বচনগুলো শুধু গাছপালা লাগানোর ক্ষেত্রেই অনুসৃত হয় না, তা প্রকৃতির শৃঙ্খলাকে জানতেও সাহায্য করে। যেমন:
ক্স    কলা রুয়ে না কেটো পাত, তাতেই কাপড় তাতেই ভাত। ( কলাগাছের পাতা না কাটলে ভালো ফল হয়। সেই কলা বেচেই চাষী ভাতকাপড় কেনার টাকা আয় করতে পারে।
ক্স    খনা ডেকে বলে যান
           রোদে ধান ছায়ায় পান। ( ধান চাষের জন্য রোদ আর পান চাষের জন্য ছায়া দরকার। )
ক্স    গাছগাছালি ঘন রোবে না
গাছ হবে তার ফল হবে না। ( ঘন সারি করে চারা লাগালে সেই গাছে ভালো ফল হয় না। )
ক্স    বিশ হাত করি ফাঁক
     আমকাঁঠাল পুঁতে রাখ। ( আম কাঁঠাল ইত্যাদি গাছ কমপক্ষে বিশ হাত দূরত্বে লাগানো উচিত।)
ক্স    শোনরে বাপু চাষার পো,
      সুপুরি বাগে মান্দার রো
      মান্দার পাতা পচলে গোড়ায়
      ফড়ফড়াইয়া ফল বাড়ায়। ( শোন চাষীর ছেলে, সুপুরি বাগানে দু একটা মান্দার গাছ লাগাও। মান্দারের ঝরা পাতা সুপুরির জন্য ভালো সার। তাতে খুব দ্রুত গাছ ফলবান হয়ে ওঠে।)
ক্স    ষোল চাষে মূলা, তার অর্ধেক তূলা
            তার অর্ধেক ধান, বিনা চাষে পান। ( মূলার জন্য মাটি ষোলবার চাষ করতে হবে, তূলার জন্য আটবার, ধানের জন্য চারবার আর পানের জন্য কোনো চাষ দরকার হয় না।)
ক্স    তাল বাড়ে ঝোপে,
     খেজুর বাড়ে কোপে। ( তাল গাছের পাতা ছাঁটতে হয় না, তাতেই ফল ভালো হয় আর খেজুর গাছের পাতা ছেঁটে দিলে ভালো ফল হয়।)
ক্স    আউশ ধানের চাষ, লাগে তিন মাস। ( আউশ ধান চাষে তিনমাস সময় লাগে। অর্থাৎ বীজ বোনার পর ধান ঘরে তুলতে তিনমাস লাগে।)
ক্স    শুনরে বাপু চাষার বেটা,
     মাটির মধ্যে বেলে যেটা
           তাতে যদি বুনিস পটল
           তাতে তোর আশার সফল। ( শোন হে চাষার ছেলে, বেলে মাটিতে পটল চাষ করলে তোমার আশা পূরণ হবে, অর্তাৎ ভালো ফলন হবে।)

ঋতুবৈচিত্র্য ও খনার বচন: ঋতুবৈচিত্র্যের মধ্য দিয়ে ধরা পড়ে বছরের বিভিন্ন সময়ে প্রকৃতির বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলো। ঋতুচক্র আমাদের যাপিত জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে নানাভাবে প্রভাব ফেলে যায়। ফুলফল শস্যলতায় ঋতুর আবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি ধরা পড়ে। খনার বচনগুলোতে ঋতু প্রসঙ্গ এসেছে বারবার।
ক্স    আষাঢ়ে পনের শ্রাবণে পুরো, ধান লাগাও যত পারো। ( আষাঢ় মাসের ১৫ তারিখের পর থেকে পুরো শ্রাবণ ধান বোনার সময়। এ সময়ের মধ্যেই চাষীকে ধান বোনার ব্যবস্থা সম্পন্ন করে ফেলতে হবে। )
ক্স    পটল বুনলে ফাগুনে, ফলন বাড়ে দ্বিগুনে। ( ফাল্গুন মাসে পটল চাষ করলে ফলন দ্বিগুন হয়। )
ক্স    আখ আদা পুঁই, এই তিন চৈতে রুই। ( আখ, আদা, আর পুঁইশাক এই তিনটিই লাগাবার উপযুক্ত সময় হলো চৈত্রমাস।)
শেষ কথা: এ সমস্ত বচন সৃষ্টির পেছনে খনার প্রকৃতির প্রতি কী গভীর ভালোবাসা, নিবিড় পর্যবেক্ষণ আর একান্ত মনোযোগের দৃষ্টি ছিল আজকের দিনে আমরা সে কথা অনুমান করতে পারলেও অনুভব করতে পারবো না। একে অনুভব করার জন্য চাই প্রকৃতিকে নিবিষ্টভাবে অধ্যয়ন করা। একটি বিশাল জ্ঞানের গ্রন্থের মতোই প্রকৃতিকে প্রতি মুহূর্তে পাঠ করেছেন খনা। প্রকৃতির আচরণগুলোকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করে আবিষ্কার করেছেন নানা লক্ষণ, যেগুলোর সাথে মিলিয়ে তিনি লোকজীবনের সাথে তার সম্পর্কের সূত্র নির্ণয় করেছেন। খনার প্রকৃতিপাঠ এতটাই ব্যাপক ছিল আর তার সিদ্ধান্তগুলো ছিল এতই নির্ভুল যে জ্যোতির্বিদ্যায় পণ্ডিত তার শ্বশুর বরাহের খ্যাতিও খনার কাছে ম্লান হয়ে যাচ্ছিল।
কথিত আছে, পুত্রবধুর কাছে নিজের মর্যাদা ক্ষুণœ হবার ভয়ে ঈর্ষাপরায়ণ শ্বশুর বরাহ তাঁর পুত্র মিহিরকে আদেশ করেন খনার জিভ কেটে ফেলতে যাতে সে আর কোনো কথা বলতে না পারে। না করতে পারে আর কোনো সত্যবচন রচনা।
দুঃখিত খনা তাঁর বচনগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার উপায় ভাবেন। স্বামীর কাছে শেষবারের মতো তাঁর বচনগুলো বলার অনুমতি চেয়ে নেন। জিহ্বা কাটার আগে খনা তাঁর বচনগুলো লোকসমাজে বলে যান। এসব তাঁরা মুখস্থ করে নেয়।
এরপর জিভ কেটে নেয়া জ্ঞানী খনার। কালক্রমে জিহ্বাহীন বোবা খনার বচনগুলো ছড়িয়ে পড়ে অসংখ্য জিভে। হাজার বছরেরও বেশি বছর ধরে গ্রামীণ জীবনের নানা প্রসঙ্গে এগুলো চর্চিত হয়ে আসছে। সহজ ভাষা, দৈনন্দিন জীবনের চিরচেনা ছবি, আর লৌকিক ছন্দের আনন্দময় দোলা খনার বচনগুলোকে আয়ুষ্মান করে তুলেছে।
প্রকৃতিকে ভালোবাসতে গিয়ে তাকে নিবিড়ভাবে অধ্যয়ন করে স্বজ্ঞানী হওয়ার অপরাধে খনার বাকপ্রত্যঙ্গ কাটা পড়েছিলো, আর আমরা আজ হাতে কুঠার তুলে নিয়েছি প্রকৃতির জিভ কেটে ফেলার জন্য যাতে সে আর কথা বলতে না পারে।