প্রবন্ধ
কবিতার ভিত্তি
আমিরুল বাশার

গল্প
ফজলুল আলম

নিবন্ধ
রবীন্দ্রনাথের নন্দলাল
শেখ মিরাজুল ইসলাম

উপন্যাস
আর জে রাজহংসী
মারুফ রায়হান

বিশ্বসাহিত্য
শতবর্ষের নীরবতা
আকিল জামান ইনু

গদ্য
কবিতা কি জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে

জর্নাল
নুরুল করিম নাসিম

শিল্পকলা
বাংলাদেশের চিত্রকলায় রেখা
নাজিব তারেক

বইপত্র

বিশেষ রচনা
হোমারের জন্য প্রশস্তিগাথা
অনুবাদ: মাসরুর আরেফিন

স্মরণ
 সৈয়দ শামসুল হক

জীবনকথা
এক আশ্চর্য বয়স
ওয়াসিমা ওয়ালী

অনুবাদ গল্প
বন্ধন
ডাব্লিউ ডাব্লিউ জেকবস
অনুবাদ: তানিয়া হাসান

টরেন্টোর চিঠি
শামীম আহমেদ

অস্ট্রেলিয়ার চিঠি
ফজল হাসান

এবং
কবিতাগুচ্ছ

১০ বর্ষ ৫ সংখ্যা
ডিসেম্বর  ২০১৭

লেখক-সংবাদ : ছোটগল্পে ছোট ছোট বোমা ফাটানোর নতুন কৌশল আফসান চৌধুরীর * উপন্যাস লিখছেন কাফকা-সাহিত্যের অনুবাদক-ব্যাখ্যাকারী মাসরুর আরেফিন * টিভির স্থিরতাবিনাশী সময়কে সরিয়ে গল্প-ফিকশনে ফিরলেন মাসউদুল হক * হাওড়ে হাওড়ে সরকার আমিনের তুমুল পঞ্চাশ * হিন্দি কবিতার অনুবাদে মজেছেন সাবেরা তাবাসসুম * অক্টোবরে দেশে ফিরছেন আহমাদ মাযহার, সঙ্গে মার্কিন মুল্লুকের টাটকা সব উপাখ্যান *  রচনাসমগ্রের ভূমিকা লিখছেন কাজল শাহনেওয়াজ * রঙ-তুলিকে কিছুটা বিশ্রামে দিয়ে কবিতা লেখার কলম তুলে নিলেন নাজিব তারেক * সাব্বির হাসান নাসির এবার সুফিসাহিত্যে নয়, ভ্রমণকাহিনিতে তুলে আনছেন ক’জন মহান মানব * চিত্রপ্রদর্শনী নয়, সামনে রাকীব হাসানের কাব্য-প্রকাশনা * মার্কেজের নীরবতার একশ’ বছরের সুবর্ণজয়ন্তী প্রকাশনা নিয়ে ব্যস্ত জিএইচ হাবীব *





দমবন্ধ প্রহরে
কল্যাণী রমা
‘লক্ষ মানুষ ভাত চেয়ে মরে
লক্ষ মানুষ শোকে ভেসে যায়
ঘরহীন ভাসে শত শত লোক
লক্ষ জননী পাগলের প্রায়।
রিফিউজি ঘরে খিদে পাওয়া শিশু
পেটগুলো সব ফুলে ফেঁপে ওঠে
এইটুকু শিশু, এতবড় চোখ
দিশেহারা মা কার কাছে ছোটে।

ঘরহীন ওরা ঘুম নেই চোখে
যুদ্ধে ছিন্ন ঘর-বাড়ী-দেশ
মাথার ভিতর বোমারু বিমান
এই কালো রাত কবে হবে শেষ।
শত শত মুখ হায় একাত্তুর
যশোর রোড যে কত কথা বলে
এত মরা মুখ আধ মরা পায়ে
পূর্ব বাংলা কোলকাতা চলে।’

আমরাও চলেছি। মা এক শাড়িতে, বাবা লুঙ্গি পরে, আমি বাবার ঘাড়ে পা ঝুলিয়ে, শ্যামা মার্ কোলে। এক কাপড়ে বেরিয়ে পড়েছি আমরা। মা'র পেটিকোটে বিয়ের গয়না বাঁধা। বড় সুন্দর সে গয়না। ঝলমল ক'রে। দাদুভাই সোনার বার কিনে তা দিয়ে বড় মেয়ের গয়না গড়িয়েছিল।
আমাদের আর ঘর নেই। আমরা বাচঁতে চাই। পাকিস্তানিরা ছুটে আসছে পিছনে। গ্রামে কিছু ঘরে আমাদের আশ্রয় দিল। অজানা মানুষের ভালোবাসা আমাদের বাঁচিয়ে রাখল । মাও শ্যামাকে বাঁচিয়ে রাখতে গুঁড়া দুধে জল মিশিয়ে মিশিয়ে খাইয়ে গেল । ওর চেহারা হয়েছে বায়েফ্রার বাচ্চাদের মত। বড় বড় চোখ, বিরাট মাথা, হাত পা কাঠি কাঠি। আরো পথ যেতে হ'বে।
গ্রামের মানুষ বেত কাঁটা ছড়িয়ে রেখেছে ফসলের মাঠে। কি করবে তা না হ'লে? লক্ষ লক্ষ মানুষ ফসলের মাঠ মাড়িয়ে, মৃত্যু মাড়িয়ে ভারতে চলেছে।
নিজ দেশ আর ভারতের বিভিন্ন গ্রামে নানা অজানা, অচেনা বাড়িতে থেকে অবশেষে আমরা গিয়ে পৌঁছালাম জলপাইগুঁড়ির মালবাজারে।। মার পিসির বাড়ি। দাদুভাই-এর একমাত্র বোন। বড় আদরের ছোটবোন। আমাদের চারজনকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন দিদা। দাদু, দিদা, সাধনা মাসি, কল্যাণী মাসি, ভবানী মাসি, শিবানী মাসি, শংকর মামা আমাদের জন্য কি করবে ভেবে পায় না। পাঁচ মাস কাটিয়ে দিলাম ওনাদের বাড়িতে আমরা। আমাদের কিছু নেই। আমাদের গায়ের জামা বাদে অন্য জামা-কাপড় নেই। পয়সা নেই। দাদু দিদা সবকিছুর ভার নিলেন। এইসব মানুষের ঋণ কিভাবে শোধ ক'রা যায়? মৃত্যু থেকে বাঁচিয়ে যারা আশ্ৰয় দেয়? সব দায়িত্ব নেয়? আমাদের জন্য ওদের ঘরে কিংবা মনে জায়গার অভাব হয়নি।
যুদ্ধর বোমারু বিমানের কথা মনে পড়ছে, মৃত্যুর কথা মনে পড়ছে, দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার কথা মনে পড়ছে, ব্ল্যাক-আউট -এর কথা মনে পড়ছে। সেই সাথে আমার একটা শ্রাদ্ধ বাড়ির কথাও বড় মনে পড়ছে । বহুদিন কোন উত্সবে যাইনি। ভবানী মাসিদের প্রতিবেশীর বাড়িতে শ্রাদ্ধ। আমার তো উৎসব বলে মনে হ'ল। চার বছর বয়সের যে জীবনে যুদ্ধ দাগ কেটে যায় সেখানে খাওয়া দাওয়া মানেই উৎসব, তা সে শ্রাদ্ধের খাওয়াই হোক বা না কেন। কলাপাতা পেতে খেতে বসেছি। শেষপাতে রসগোল্লা দিয়েছে। সাথে দই।
শ্যামাটা এত আস্তে খায়। কিছুই খেয়ে উঠতে পারে না। মা তাড়া দিয়ে যাচ্ছে। ‘তাড়াতাড়ি মাছটা খাও’। এক বয়স্ক মহিলা বললেন, 'বাচ্চা মানুষ, যতটুকু পেটে ধরে, ততটুকুই তো খাবে।' অপমানে মা'র ফর্সা মুখ লাল হ'য়ে উঠল।
'৭১ এর এই ঘটনাটার কথা যখনই ভাবি মা'কে আমার "সর্বজয়া" ব'লে মনে হ'য়।