প্রবন্ধ
কবিতার ভিত্তি
আমিরুল বাশার

গল্প
ফজলুল আলম

নিবন্ধ
রবীন্দ্রনাথের নন্দলাল
শেখ মিরাজুল ইসলাম

উপন্যাস
আর জে রাজহংসী
মারুফ রায়হান

বিশ্বসাহিত্য
শতবর্ষের নীরবতা
আকিল জামান ইনু

গদ্য
কবিতা কি জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে

জর্নাল
নুরুল করিম নাসিম

শিল্পকলা
বাংলাদেশের চিত্রকলায় রেখা
নাজিব তারেক

বইপত্র

বিশেষ রচনা
হোমারের জন্য প্রশস্তিগাথা
অনুবাদ: মাসরুর আরেফিন

স্মরণ
 সৈয়দ শামসুল হক

জীবনকথা
এক আশ্চর্য বয়স
ওয়াসিমা ওয়ালী

অনুবাদ গল্প
বন্ধন
ডাব্লিউ ডাব্লিউ জেকবস
অনুবাদ: তানিয়া হাসান

টরেন্টোর চিঠি
শামীম আহমেদ

অস্ট্রেলিয়ার চিঠি
ফজল হাসান

এবং
কবিতাগুচ্ছ

১০ বর্ষ ১ সংখ্যা
আগস্ট ২০১৭

লেখক-সংবাদ : ছোটগল্পে ছোট ছোট বোমা ফাটানোর নতুন কৌশল আফসান চৌধুরীর * উপন্যাস লিখছেন কাফকা-সাহিত্যের অনুবাদক-ব্যাখ্যাকারী মাসরুর আরেফিন * টিভির স্থিরতাবিনাশী সময়কে সরিয়ে গল্প-ফিকশনে ফিরলেন মাসউদুল হক * হাওড়ে হাওড়ে সরকার আমিনের তুমুল পঞ্চাশ * হিন্দি কবিতার অনুবাদে মজেছেন সাবেরা তাবাসসুম * অক্টোবরে দেশে ফিরছেন আহমাদ মাযহার, সঙ্গে মার্কিন মুল্লুকের টাটকা সব উপাখ্যান *  রচনাসমগ্রের ভূমিকা লিখছেন কাজল শাহনেওয়াজ * রঙ-তুলিকে কিছুটা বিশ্রামে দিয়ে কবিতা লেখার কলম তুলে নিলেন নাজিব তারেক * সাব্বির হাসান নাসির এবার সুফিসাহিত্যে নয়, ভ্রমণকাহিনিতে তুলে আনছেন ক’জন মহান মানব * চিত্রপ্রদর্শনী নয়, সামনে রাকীব হাসানের কাব্য-প্রকাশনা * মার্কেজের নীরবতার একশ’ বছরের সুবর্ণজয়ন্তী প্রকাশনা নিয়ে ব্যস্ত জিএইচ হাবীব *





রবীন্দ্রনাথের নন্দলাল
শেখ মিরাজুল ইসলাম
শিল্পাচার্য নন্দলাল বসুর সাথে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিচয় ১৯০৯ সালের দিকে। মাধ্যম ছিলেন নন্দলালের শিল্পগুরু অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কালক্রমে এই দুই ঠাকুরের অন্যতম প্রিয়পাত্র ও প্রেরণার উৎস হয়ে পড়লেন নন্দলাল।
অবনীন্দ্রের ওরিয়েন্টাল আর্ট সোসাইটি ও রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন, এই দুই স্থানেই নন্দলালের বিকল্প ছিল না বলা যায়। ১৯০৫ সালের ১৫ আগস্ট অবনীন্দ্রনাথ সরকারী চারুকলা বিদ্যালয়ের উপাধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেন। তখনই বিহারের মুঙ্গের জেলার খড়গপুরের নিসর্গের এই জাতশিল্পী অবনীন্দ্রের সাহচর্যে আসেন। নন্দলালের বয়স ছিল তেইশ বছর। অবনীন্দ্রের ভাবশিষ্য হিসেবে শিল্পী জীবন শুরু করলেও ক্রমশ আত্মস্থ করে নেন নিজস্ব শিল্পভাষা। এরপর চিত্রী নন্দলাল ও কবি রবীন্দ্রনাথ প্রথম পরষ্পরের সাথে পরিচিত হন জোড়াসাঁকো’তে। নন্দের বয়স তখন সাতাশ, রবির আটচল্লিশ। গড়ে ওঠে আমৃত্যু সম্পর্ক। অবনীন্দ্র সেতু বন্ধনটি গড়ে দিলেও নন্দের বিচ্ছেদে তিনি প্রায় কাতর থাকতেন। শান্তিনিকেতন হতে যখন রবি কাকা অনুরোধ পাঠালেন নন্দলালের জন্য, অবনীন্দ্র বলেছিলেন,
‘ তুমি যখন ডেকেছো তখন ও (নন্দ) নিশ্চয় যাবে, কিন্তু আমার ক্ষতি হবে।’
আবার শান্তিনিকেতন হতে নন্দলাল কলকাতায় তাঁর গুরুর কাছে যখন ফিরে এলেন অবনীন্দ্র বললেন,
‘ তোমাকে ফিরে পেয়ে কেমন মনে হচ্ছে জান? যেন এক বোতল ব্র্যাণ্ডি খেয়ে মনটা চাঙ্গা হল।’
কিন্তু ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও নন্দলাল গুরুর মন চাঙ্গা রাখতে পারলেন না। কলকাতার হট্টগোলের চেয়ে শান্তিনিকেতনই তাঁর কাছে বেশী আপন মনে হলো।
১৯২০ সাল হতে পাকাপাকিভাবে ‘মাস্টার-মশাই’ হয়ে শান্তিনিকেতনে থিতু হলেন। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, নন্দলালের অন্তরে রবীন্দ্রনাথ যতটুকু ছাপ ফেলেছিলেন, ঠিক সমপরিমান অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিলেন নন্দলাল কবিগুরুর হৃদয়ে।
১৯১৪ সালের এপ্রিল মাসে নন্দলালের আনুষ্ঠানিক পদার্পণ হয় শান্তিনিকেতনে। শান্তিনিকেতনে তাঁকে ১৯১৪ সালের ১ মে (১২ বৈশাখ) বিশেষ ভাবে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। সেই সভায় কবিগুরু নন্দলাল’কে উৎসর্গ করে নিজের লেখা কবিতা পাঠ করলেন। কবিতাটির অংশ বিশেষ,
‘ শ্রীমান নন্দলাল বসু পরম কল্যাণীয়েষু
তোমার তুলিকা রঞ্জিত করে ভারত-ভারতী-চিত্ত।
বঙ্গলক্ষ্মী ভাণ্ডারে সে যে যোগায় নূতন বিত্ত।
তোমার তুলিকা কবির হৃদয় নন্দিত করে, নন্দ!
তাই ত কবির লেখনী তোমায় পরায় আপন ছন্দ।’
এমন অভিনন্দনের পর নন্দলাল দারুণ অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি জানান,
‘এই অভিনন্দনের পরে আমার একটা অদ্ভুত অনুভূতির ঘটনা হলো। গুরুদেব আমাকে বরণ করে নিলেন অর্ঘ্য দিয়ে, আশীর্বাদ করলেন কবিতা পড়ে। ... সহসা আমার মনে হলো। আমাতে যেন আমি নেই। আমার দেহটা আছে বটে, তবে অতি স্বচ্ছ হয়ে গেছে। ... কবির ভেতর দিয়ে মহর্ষির আশীর্বাদ যেন আমাকে ছুঁয়ে গেল। আমি যেন শান্তিনিকেতনের আশ্রমের অন্তরে প্রবেশ করলুম।’
উল্লেখ্য, ১৯৬৬ সালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের ‘সব থেকে আপন’ নন্দলাল নিষ্ঠার সাথে শান্তিনিকেতনে তাঁর উপর অর্পিত আস্থার প্রতিদান দিয়ে গিয়েছিলেন। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঐতিহাসিক বিচারে সে সূত্রে একটা ধন্যবাদ পেতেই পারেন।

       দুই।
লেখালেখির পাশাপাশি আঁকাআঁকির সহজপাঠে নন্দলালের উৎসাহই মূলত রবীন্দ্রচৈতন্য’কে উদ্বেলিত করেছিল। রবীন্দ্রনাথ নিজেও নন্দলালের চিত্ররূপে বিভোর হয়ে কাব্য রচনায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। আবার রবীন্দ্র রচনার গ্রন্থচিত্রণে নন্দলালের আলাদা বৈচিত্র্য ছিল চোখে পড়ার মতো। ক্ষেত্রবিশেষে কবিগুরু নিজেই নন্দলালের কাজে বেশী আবিষ্ট থাকতেন। ‘আলাপচারি রবীন্দ্রনাথ’ রচনায় কবি জানাচ্ছেন,
 “আমি কি আর ছবি আঁকি। শুধু আঁচড়-মাচড় কাটি। নন্দলাল তো আমাকে শেখালেনা; কত বললুম। ও হেসে চুপ করে থাকে।”
রবীন্দ্রনাথ বুঝতেন নন্দলালের এই মৃদু হাসি প্রশ্রয়ের লক্ষণ।
১৯২৮ সালের ৫ ডিসেম্বর নির্মলকুমারী মহলানিবেশ’কে লেখা চিঠিতে রবীন্দ্রনাথকে বলতে শুনি,
 “ ... আমি কিছু কাজ করি কিছু ছবি আঁকি। ছবি আঁকতে পারি এ একটা নতুন আবিষ্কার তাই প্রত্যেকবারে সেটাতে নতুন উৎসাহ পাচ্ছি। নন্দলালের প্রশংসা পেয়ে কাজটার পরে শ্রদ্ধা জন্মেছে।” এভাবে অজস্রবার নন্দলালের প্রসঙ্গ এসেছে। কবির শিল্পসাধনায় নন্দলালের গুরুত্ব নিয়ে কাজ করতে গিয়ে গবেষকগণ বিস্মিত হয়েছেন। পর্যায়ক্রমে জেনেছেন রবীন্দ্রনাথের ‘চিত্রশিল্পী’ হয়ে ওঠার পেছনে তাঁর ভূমিকা কতখানি।
১৯০৯ সালে রবীন্দ্রনাথ তাঁর কাব্য সংকলন ‘চয়নিকা’ সম্পাদনা করছিলেন। কবি সংকলনটির ইলাস্ট্রেশনের দায়িত্ব দেন নন্দলালের ওপর। তাঁদের সেই প্রথম ভাবের বিবরণ পাওয়া যায় পঞ্চানন মণ্ডলের ‘ভারতশিল্পী নন্দলাল’ হতে,
“ কবির সাথে আমার প্রথম দেখা জোড়াসাঁকোর লালবাড়িতে। যোগাযোগ হলো কি করে সে-কথা বলি। আমাদের হাতিবাগানের বাড়িতে এসেছিলেন বাঁকুড়ার এক সাধু। ... পূজার জন্য তাঁকে ‘তারা’ মূর্তি করে দিয়েছিলুম। ... তার কিছুদিন পরেই কবির জোড়াসাঁকোর বাড়িতে সহসা ডাক পড়লো আমার। সসঙ্কোচে গেলুম আমি দেখা করতে। কবি বললেন, তোমার তারামূর্তি আমিদেখেছি। বেশ হয়েছে। তা তোমাকে এখন আমার কবিতার বই (চয়নিকা) ইলাস্ট্রেট করতে হবে। ... কবিকে বললুম, আমি আপনার বই পড়িনি বললেই হয়। পড়লেও মানে কিছু বুঝিনি। কবি বললেন, তাতে কি, তুমি পারবে ঠিক। এই আমি পড়ছি, শোনো। বলে, তিনি তাঁর চয়নিকার কবিতা পড়তে আরম্ভ করলেন।”
ওয়াশ পদ্ধতিতে নন্দলাল চয়নিকার জন্য সাতটি ছবি আঁকেন।
সেগুলো হচ্ছে,
১। কেবল তব মুখের পানে চাহিয়া ২। ধূপ আপনারে মিলাইতে চাহে গন্ধে ৩। যদি মরণ লভিতে চাও ৪। খেপা খুঁজে ফেরে পরশপাথর ৫। হে ভৈরব হে রুদ্র বৈশাখ (শিব তাণ্ডব) ৬। ভূমির পরে জানু গাড়ি তুলি ধনুঃশর (নকলবুদি) ৭। আমারে নিয়ে যাবি কে রে দিন শেষের শেষ খেয়ায়।
কিন্তু নন্দলালের আঁকা ছবিগুলো রবীন্দ্রনাথ’কে পুরোপুরি তৃপ্তি দেয়নি। মূল ছবির রস বই ছাপানোর পর ফুটে ওঠেনি।
২৮ সেপ্টেম্বর ১৯০৯ সালে কবিগুরু চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়’কে লেখেন, ‘নন্দলালের পটে যে রকম দেখেছিলুম বইয়ে তার অনুরূপ রস পেলুম না। বরঞ্চ একটু খারাপই লাগলো।’ তবে কবিকে আর ভবিষ্যতে নন্দের ছবির ব্যাপারে টেনশনে পড়তে দেখা যাবে না। কবি আর চিত্রীর দ্বৈতমিলনে জন্ম নিয়েছিলো পংক্তি-রেখার বৈভবময় অজস্র সৃষ্টিমালা। অনেক পরে রবীন্দ্রনাথ নন্দলাল’কে এক চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘ আমি বাজিয়েছি বাঁশের বাঁশি আর তোমরা সেই বাঁশে মঞ্জুরী ফুটিয়েছ।’ তোমরা’ - বহু বচনে রবীন্দ্রনাথ উল্লেখ করেছিলেন নন্দলাল বসু ছাড়াও সমসাময়িককালে রবীন্দ্র- রচনায় অন্যান্য গ্রন্থ চিত্রকরদের কথা। তবে একমাত্র হরিশ চন্দ্র হালদার ওরফে ‘হ চ হ’ (রবীন্দ্রনাথের প্রথম গ্রন্থচিত্রী) ছাড়া বাকী সবাই রবীন্দ্র-পরবর্তী যুগেও দীপ্যমান ছিলেন।
১৯১১ সালে (বাংলা ১৩১৭) ‘ভারতী’ পত্রিকায় জৈষ্ঠ্য সংখ্যায় ছাপা হলো নন্দলালের ৬ ইঞ্চি বাই ৪ ইঞ্চি পোস্টকার্ড সাইজে আঁকা ‘দীক্ষা’ শিরোনামের জলরং। ছবিটি দেখে প্রচণ্ডভাবে আলোড়িত হলেন রবীন্দ্রনাথ। জন্ম নিলো ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের বিখ্যাত ‘নিভৃত প্রাণের দেবতা’ কবিতাটি। এরপর ১৯১২ সালের জানুয়ারিতে ‘মডার্ণ রিভিউ’ পত্রিকায় সিস্টার নিবেদিতা অনুবাদ করলেন ‘কাবুলিওয়ালা’। সাথে ছাপা হলো নন্দলালের লাইন-ড্রয়িং এর ওয়াশ ( ৭ ইঞ্চি বাই ৫ ইঞ্চি) পুরো পাতা জুড়ে। একই বছর সাড়া জাগানো ‘ছিন্নপত্র’ গ্রন্থের প্রচ্ছদ আঁকলেন নন্দলাল। ১৯১৩ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা ম্যাকমিলান এণ্ড কোং প্রকাশ করলো রবীন্দ্রনাথের কবিতাগুচ্ছ ‘ ঞযব ঈৎবংপবহঃ গড়ড়হ’; বইটির জন্য ছবি এঁকেছিলেন নন্দলাল, অবনীন্দ্রনাথ, সুরেন্দ্রলাল বন্দ্যোপাধ্যায় ও অসিতকুমার হালদার। নন্দলাল আঁকেন দুটো রঙ্গিন ছবি, ঞযব ঐবৎড় এবং ঞযব ঐড়সব;
বাস্তবিক অর্থে এরপর হতে রবীন্দ্রবলয়ে নন্দলালের প্রভাব আরো উচ্চকিত লয়ে প্রতিভাত হয়।

তিন।
নন্দলাল বিভিন্ন সময়ে কবিগুরুর সফরসঙ্গী হয়েছিলেন।
১৯১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে শিলাইদহে  ‘পদ্মা বোটে অতিথি হয়ে নন্দলাল প্রচুর ছবি আঁকেন। এরপর ১৯২৪ সালের ২১ মার্চ ‘ইথিওপিয়া’ নামের জাহাজে চেপে রবীন্দ্রনাথ সমভিব্যাহারে বার্মা, চীন, জাপান ভ্রমণ। যদিও ১৯১৬ সালে প্রথম জাপান ভ্রমণে কবিগুরু জাপানী চিত্রকলা সম্পর্কে বিশদ ধারণা নেবার জন্য নন্দলাল’কে সাথে নেবার কথা ভেবেছিলেন, কিন্তু নেয়া হয়নি। কিন্তু ১৯২৪ সালের প্রাচ্য-ভ্রমণ নন্দলালের শিল্পদর্শনে গভীর ছায়া ফেলেছিল। প্রাচ্যের অংকনরীতির স্পর্শে নন্দ আরো তীক্ষ্ম হয়ে উঠেছিলেন। এই ভ্রমণের উপর ভিত্তি করে পৃথক পৃথকভাবে নন্দলালের ‘চীন-জাপানের চিঠি’ এবং রবীন্দ্রনাথের ‘চীন ও জাপানে ভ্রমণবিবরণ’ ছাপা হয়েছিলো ১৯২৪ সালে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় যথাক্রমে আশ্বিন ও কার্তিক সংখ্যায়। সেখানে নানা প্রসঙ্গে নন্দলালের লেখায় কবিগুরু সম্পর্কে আর কবিগুরু তাঁর লেখায় বিধৃত করেছিলেন নন্দলাল’কে।
৭ ফেব্রুয়ারি ১৯২৬ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন আমন্ত্রিত হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন তখনো তাঁর ইচ্ছে ছিল সাথে নন্দলাল’বসুকে সাথে আনার। সে বছর ১০ জানুয়ারি রমেশচন্দ্র মজুমদারকে লেখা চিঠিতে উল্লেখ করেছিলেন, ‘ ... আপাতত এইটুকু বলে রাখছি আমাদের চিত্রকলাকুশল নন্দলাল বসুকে নিয়ে যাব, কালীমোহন ঘোষও যাবেন।’ কিন্তু সে যাত্রায় নন্দলাল শেষ পর্যন্ত আসতে পারেন নি।
ইতিপূর্বে ১৯১৮ সালে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নন্দলাল বসু, সুরেন্দ্রনাথ কর, নবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও অসিতকুমার হালদারের আঁকা আটটি রঙ্গিন ও তেইশটি সাদা কালো ছবি নিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল এরঃধহলধষর ধহফ ঋৎঁরঃ এধঃযবৎরহম,এর সচিত্র সংকলন। তবে ১৯১৭ সালে নন্দলাল ‘গীতবিতান- এর জন্য ছবি এঁকেছিলেন, এ’ জাতীয় তথ্য নিয়ে সংশয় আছে। কারণ সচিত্র গীতবিতান আদৌ প্রকাশিত হয়নি। ‘গীতবিতান-এর প্রথম প্রকাশ আরো অনেক পরে তিন খণ্ডে ১৯৩১ ও ১৯৩২ সালে।
১৯২৩ সালে নন্দলালের পরবর্তী উল্লেখযোগ্য রেখাচিত্রণ ছিল কবিগুরুর গান  ‘দুই হাতে কালের মন্দিরা যে’ অবলম্বনে। ১৯২২ সালে শান্তিনিকেতনে আম্রকুঞ্জে এক গুজরাটি মেয়ের লোকনৃত্য দেখে রবীন্দ্রনাথ গানটি রচনা করেছিলেন।
১৯২৪ সালে নন্দলাল টেম্পেরা পদ্ধতিতে আঁকলেন ‘পসারিণী (২০ বাই ৩৩ সেমি)। এই চিত্ররূপে অনুপ্রাণিত হয়ে কবি লিখলেন ‘পসারিণী’ কবিতাটি। পরবর্তীতে কাব্যগ্রন্থ ‘বিচিত্রা’তে এই ছবি-কবিতার যুগল ঠাঁই হয়। ১৯২৫ সালে শিল্পী আঁকলেন কবির ‘চিত্ত সেথা ভয়শূণ্য’এবং ‘এ মোর প্রার্থনা’ কবিতা অবলম্বনে টেম্পেরা। কাগজ কেটে ১৯২৬ সালে কোলাজ করলেন ‘নটীর পূজা নাটকের প্রচ্ছদ। ১৯২৭ সালে ওয়াশ টেম্পেরায় আবার আঁকলেন ‘নটীর পূজা’  (৬৩ ইঞ্চি বাই ৩৪ ইঞ্চি) নতুন আঙ্গিকে। শিল্পীকন্যা গৌরী দেবী ছিলেন নাটকটির নটীর নাম ভূমিকায়। ১৯২৭ সালেই ‘বিচিত্রা’ পত্রিকার প্রথম বর্ষে পঞ্চম সংখ্যায় (কার্তিক ১৩৩৪) মুদ্রিত হলো নন্দলালের আঁকা ‘দেবদারু’র সাথে রবীন্দ্রনাথের ‘দেবদারু’কবিতাটি। ছবি ও ছন্দের যুগলমিলনে। কবিতাটি পরে ‘বনবাণী’  কাব্যগ্রন্থে সংকলিত হয়। দেবদারুর ছবিটি কার্সিয়াং হতে নন্দলাল পোস্টকার্ডে এঁকে কবিকে পাঠিয়েছিলেন।
একইভাবে শিলং-এ থাকতে রবীন্দ্রনাথ নন্দলালের আরো একটি ছবি কাব্যরূপ দিয়েছিলেন ‘শুকসারী’ শিরোনামে। কবিতাটির শিরোনামের নীচে লিখেছিলেন,
“শ্রীযুক্ত নন্দলাল বসুর পাহাড়-আঁকা চিত্র-পত্রিকা উত্তরে”।  সে বছরই নন্দলাল রবীন্দ্রনাথের সাথে সুমাত্রা, জাভা, বালি-তে ভ্রমণসঙ্গী হন। বাটিক পদ্ধতিতে তখন হতেই তাঁর হাতেখড়ি। ‘জাভা-যাত্রীর পত্র’ গ্রন্থে ২৮ জুলাই ১৯২৭ সালে মালাক্কা হতে লেখা রবীন্দ্রনাথের এক চিঠিতে নন্দলালের আরও একটি স্কেচকার্ডের উল্লেখ পাওয়া যায়। সেই চিত্রের সুবাদের কবি লিখলেন ‘স্যাকরা’ কবিতাটি। কবির জিজ্ঞাসা ছিল,
‘কার লাগি এই গয়না গড়াও,
যতন ভরে।’
এর অন্তর্নিহিত জবাব কবি মূলত খুঁজে ফিরেছিলেন নন্দলাল বসুর রেখার ঐশ্বর্য গরিমায়।


চার।
আঁকাআঁকির ব্যাপারটা রবীন্দ্রনাথ ‘খেলাচ্ছলে বেলা কাটাবার সঙ্গিনী’ কিংবা ‘অবসরকালে বিনা প্রয়োজনে সেই ছবি আমি করেছি অন্বেষণ’ প্রভৃতি উপমায় বিধৃত করেছিলেন। তারপরও এই নেশার উৎকর্ষ সাধনের জন্য আপ্রাণ সচেষ্ট ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা চর্চা সম্পর্কিত প্রচুর তথ্য-উদ্ধৃতি এই পর্যায়ে প্রাসঙ্গিক হবেনা। তাই আলোচনা কেবলমাত্র নন্দলাল বসুকে ঘিরেই সীমাবদ্ধ রাখতে হচ্ছে। বিশেষত যেখানে শিল্প ও সাহিত্যের পারস্পরিক লেনদেন এই দুই পুরুষের মাঝেই পেয়েছে ‘আঁটি-মাটির’ যোগসূত্র।
১৯২৮ সালটি রবীন্দ্রনাথ ও নন্দলানের হার্দিক সম্পর্কে আরো গাঢ় করে তোলে। ইতিমধ্যে নন্দের ছবির উত্তরে কবি লিখলেন ‘প্রচ্ছন্ন’ কবিতাটি। প্রকাশকাল ১০ আশ্বিন, ১৩৩৫ সন। সেই বছর ১৫ জুলাই শান্তিনিকেতনে মহাসমারোহে পালিত হলো হলকর্ষণ উৎসব। পুরো সভামণ্ডপ’কে মনের মতো সাজিয়েছিলেন নন্দলাল। এই হলকর্ষণ উৎসবকে কেন্দ্র করে নন্দলাল এক বিশাল স্মারক আঁকলেন ইতালীর ফ্রেস্কো পদ্ধতিতে। দেয়ালে ছয়টি প্যানেলে উপস্থাপন করলেন পণ্ডিত এলমর্হাস্ট লাঙ্গল ধরে আছেন, রবীন্দ্রনাথ সেই লাঙ্গল স্পর্শ করে আর্শীবাদ করছেন এবং বিধুশেখর শাস্ত্রী মন্ত্রপাঠ করছেন। ফ্রেস্কোটির একদিকে আছে বেদমন্ত্র, অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের গান - ‘ফিরে চল মাটির টানে/যে মাটি আঁচল পেতে/ চেয়ে আছে মুখের পানে’।
এই হলকর্ষণ ভিত্তিচিত্রের জন্য প্রথম রেখাংকন ব্রাশ ড্রইং (১০৯.৬ বাই ৯.৫ সে.মি) এবং বৃক্ষরোপণ উত্সবের শোভাযাত্রা লিনোকাটে (সাড়ে ১১ বাই ৩২ সে মি) নন্দলাল এঁকেছিলেন। আশ্বিনের ‘প্রবাসী’তে নন্দলালের হলকর্ষণ উৎসবের ছবিটি বিবরণসহ ছাপা হয়েছিল। একই সময় কার্তিক মাসের দিকে গগেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে লেখা এক চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ নন্দলাল বসুর উদ্ধৃতি দিয়ে জানাচ্ছেন,
“নন্দলাল বলেছে কলকাতায় কোনো একসময় স্বতন্ত্র একজিবিশন করাবে’। কারণ ততদিনে কবির ছবি আঁকার নেশা আরো চেপে ধরেছিল। এই প্রসঙ্গে ১৯২৭ সালে প্রবাসীতে রবীন্দ্রনাথের আলাপ-আলোচনা রচনাটির উল্লেখ করতে হয়। মূলত চিত্রী নন্দলালের সাথে কবিগুরুর এই আলাপ-সালাপ চিত্রকলা সম্পর্কে। লেখাটির শুরুতেই আছে, “শিল্পকলার উদ্দীপনা দিয়ে নন্দলানের সঙ্গে আমার যে কথাটা হয়েছিল সেটা ভেবে দেখবার ...”। শিল্পকলার বিভিন্ন প্রসঙ্গে নন্দলালের কিছু জিজ্ঞাসার প্রত্যুত্তরই হলো এই ‘আলাপ-আলোচনা’।
১৯২৯ সালে নন্দলাল পূণর্বার আকলেন ‘নটীর পূজা’ রেখাচিত্রে । সেই বছর ২৭ পৌষ রবীন্দ্রনাথ লিখলেন নন্দলালের একটি ছবি দেখে মহুয়া’র ‘প্রত্যাগত’ কবিতাটি। এর বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন নির্মলকুমারী মহলানবীশকে,
“আমি একদিন আমার লিখবার টেবিলে বসে লিখছি হঠাৎ নন্দলাল ঘরে ঢুকে আমার সঙ্গে কোনো কথা না বলে সামনের দেয়াল জুড়ে ছবিখানা এঁটে দিয়ে ঘর থেকে চলে গেল। তখন ওর ঘরে ‘গৌরীদান’ আসন্ন - সেই সময় বসে ছবিখানা এঁকেছে। বোধ হয় কন্যার বিচ্ছেদ-দুঃখ মন থেকে সরিয়ে রাখবার জন্যে এই সময় বসে ছবি আঁকা। ওর ঐ রকম কিছু না বলে শুধু ছবিখানা আমার চোখের সামনে ধরে দিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিতটুকু বুঝতে দেরী হলো না; আর্টিস্ট জানতে চায় আমার মনোভাবটা। চেয়ে চেয়ে ছবিখানা দেখলুম আর তখনি কবিতাটা তৈরি হয়ে গেল। খুশি হলুম এইটুকু ওকে দিতে পেরে, কারণ ওর একটা ধরণ আছে কখনো আমার কাছে কিছু চায় না; তাই এই নিঃশব্দ ইঙ্গিতে জানানো ইচ্ছেটুকুর প্রকাশে মনে মনে কৌতুক অনুভব করেছিলুম। আর্টিস্ট জোর করে চাইলেই পারতো, খুশি হয়েই দিতুম, কিন্তু তা ও নেবেনা। ভারি মজার মানুষ আমার নন্দলাল। এইজন্যে ওকে আমি এত ভালোবাসি”। (দেশ ২৫ চৈত্র ১৩৬৭)  
১৯২৯-৩০ সালে শান্তিনিকেতনে কলাভবনে নতুন ঘরগুলো সাজানোতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন নন্দলাল তাঁর শিষ্যেদের সাথে নিয়ে। সেসময় রবীন্দ্র-পরিচয় সভা নামে একটি সমিতি গঠিত হয়। এই সমিতির উদ্যেগে প্রকাশিত ‘রবীন্দ্র পরিচয় পত্রিকা’র (১৯৩২) সুবাদে জানা যায়, রবীন্দ্র-পরিচয় সভার প্রথম অধিবেশনের মূল আলোচক ছিলেন নন্দলাল বসু। তাঁর আলোচনার বিষয় ছিল, ‘ভারতশিল্পে রবীন্দ্রনাথ’। এরপর ১৯৩০ সালের শুরু দিকে নন্দলালের লিনোকাটে আঁকা ছবি সম্বলিত ‘সহজপাঠ’ প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ প্রকাশিত হলো।
এরিমধ্যে রবীন্দ্রনাথ প্রবল উদ্যমে কলম ছেড়ে তুলি নিয়ে মেতে উঠেছেন। শান্তিনিকেতনে নন্দলাল ও অন্যান্য শিল্পীদের উৎসাহ সাহচর্যে ক্রমাগত এঁকে চলেছেন। কবির উদ্ধৃতিতে, “এক সময় আমি ছবি আঁকতে বসতুম। আমার অবশ্য ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল অবন, নন্দলাল ছবি আঁকতে দেখেছি তাদের। কিন্তু আমার মনের ভিতর যেটা এল সেটা কোনো নোটিশ দিয়ে আসেনি।” (আলাপচারি রবীন্দ্রনাথ)।
তারপরও তুলিতে কতটুকু দক্ষতা অর্জিত হলো কিংবা এর মূল্যায়ন কেমনধারা হবে তা নিয়ে কবি বিশেষ চিন্তিত ছিলেন জীবনের শেষ সময় অব্দি। শেষ বয়সেও রবীন্দ্রনাথের এই দ্বিধা শুনতে পাই, “লিখতে পারি তা আমি জানি, সেখানে আমার নিজের লেখার শক্তির দৃঢ় বিশ্বাস আছে, কিন্তু আঁকা সম্বন্ধে আজো আমার সংকোচ যায় না। আমি তো নন্দলাল অবনের (অবনীন্দ্রনাথ) মতো আঁকতে শিখিনি, তাই অনেক সময় মনে হয়, ওটা আমার কাজ নয়”। (রবীন্দ্র চিত্রকলা, মনোরঞ্জন গুপ্ত)
ততদিনে রবীন্দ্রনাথ দুই হাজারের ওপর ছবি এঁকে ফেলেছেন।


পাঁচ।
১৯৩০ সালে রবীন্দ্রনাথ প্যারিসে তাঁর ছবির প্রদর্শনী করে অভূতপূর্ব সাড়া পেয়েছিলেন। সে বছর ২৯ জুন এক চিঠিতে নন্দলালকে কবি জানাচ্ছেন, “আমার ছবিগুলি শান্তিনিকেতন চিত্রকলার আদর্শকে বিশ্বের কাছে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে। এই খ্যাতির প্রধান অংশ তোমাদের প্রাপ্য। কেননা তোমরা নানা দিক হতে তোমাদের আলেখ্য উৎসবে আগ্রহে আনন্দে অন্তরে অন্তরে আমাকে উৎসাহিত করেছ”।
১৯৩১ সালের ২৪ এপ্রিল কলাভবনে আর্ট-বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ ও নন্দলালের মধ্যে যে কথোপকথন হয় তা দ্রুতলিখনে লিপিবদ্ধ করেছিলেন কবি অমিয় চক্রবর্তী। শ্রী সনৎকুমার বাগচী’র ‘রবীন্দ্র-পাণ্ডুলিপি পরিচয়’ প্রবন্ধে এর উল্লেখ আছে। শিল্প-সমালেচকদের জন্য সেটি অবশ্য পাঠ্য। ১৯৩১ সালের জুলাই মাসে নন্দলাল ভূপাল যাত্রায় রবীন্দ্রনাথের সফরসঙ্গী হলেন। দুই শিল্পী আগ্রহভরে সাঁচির স্তুপ দেখলেন। ২১ জুলাই অসিত হালদারকে কবি লেখেন, “এখানে সাঁচির কীর্তি দেখে খুবই খুশি হয়েছি। নন্দলাল আমার সঙ্গী হয়ে এসে দেখে গেল”।
১৯৩১ সালেই নন্দলাল বসুর একটি রঙ্গিন ছবি অবলম্বনে কবি লেখেন ‘বীথিকা’ কাব্যগ্রন্থের ‘গোধূলি’ কবিতাটি। ১৯৩২ সালে (১৩৩৯, কার্তিক সংখ্যা) বিচিত্রা’ পত্রিকায় ‘প্রাসাদভবনে’ শিরোনামে কবিতাটি ছাপা হয়। কবিতাটির শেষে সম্পাদকের মন্তব্য ছিল ঃ ‘এই কবিতাটি নন্দলাল বসুর ছবি দেখিয়া রবীন্দ্রনাথ লিখিয়াছেন।’ অবশেষে ১৯৩৩ সালে ‘বিচিত্রিতা’ গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। যাঁদের আঁকা চিত্র এতে স্থান পেয়েছিল তাদের মধ্যে নন্দলাল বসু ছাড়াও ছিলেন গগেন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ, সুরেন কর, রমেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, ক্ষিতিন্দ্রমোহন মজুমদার, প্রতিমা দেবী, মনীষী দে ছাড়াও স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ নিজে। ‘বিচিত্রিতা’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ উৎসর্গ করেছিলেন প্রিয় নন্দলাল বসুকে। উৎসর্গপত্রটিতে কবি লেখেন,
“আর্শীবাদ
পঞ্চাশ বছরের কিশোর গুণী নন্দলাল বসুর প্রতি
সত্তর বছরের প্রবীন যুবা রবীন্দ্রনাথের আর্শীভাষণ ....
ছবির পরে পেয়েছ তুমি রবির বরাভয়
ধূপছায়ার চপল মায়া করেছ তুমি জয়...
তোমারি খেলা খেলিতে আজি উঠেছে কবি মেতে
নববালক জন্ম নেবে নতুন আলোকেতে।
ভাবনা তার ভাষায় ডোবা,
মুক্ত চোখে বিশ্বশোভা     
দেখাও তারে, ছুটেছে মন তোমার পথে যেতে”। (৯ অগ্রহায়ন, ১৩৩৮)
১৯৩২ সালের ফ্রেব্রুয়ারিতে দি ইন্ডিয়ান সোসাইটি অফ অরিয়েন্টাল আর্টের উদ্যোগে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নন্দলাল বসুর নেতৃত্বে চিত্রকর রবীন্দ্রনাথকে অর্ঘ্যপ্রদান করা হয়। এরপর ১৯৩৩ সালের ২৩ নভেম্বর শান্তিনিকেতন হতে রবীন্দ্রসপ্তাহ উদযাপনে যোগ দিতে কবিগুরু বিশাল দল নিয়ে বোম্বে পৌঁছেন। যথারীতি সফরসঙ্গী হন নন্দলাল। ‘তাসের দেশ’ নাটিকার অভিনয়ে রূপসজ্জার মূল দায়িত্বে ছিলেন তিনি। পরবর্তীতে একইভাবে ১৯৩৪ সালের ৯ মে ‘ইঞ্চাঙ্গা’ জাহাজে কলম্বোতে কবির ভ্রমণসঙ্গী হলেন নন্দলাল। সেখানে একটি মন্দিরের ভিত্তি চিত্রিত করবার ভারও তাঁকে দেয়া হয়। এর পূর্বে নন্দলালের জীবনে একটি ছোট্ট অথচ তাৎপর্যময় ঘটনা ঘটে। ১৯৩৩ সালে নন্দলালের মধ্যে হঠাৎ মানসিক পরিবর্তন দেখা দেয়। এক রকম অধ্যাত্ম-সঙ্কটে শিল্পী নিপতিত হন। অবশেষে শ্রীঅরবিন্দের সান্নিধ্যে এসে মানসিক শক্তি আবার ফিরে পান। এর পরপরই ১৯৩৪ সালের ৭ মার্চ রবীন্দ্রনাথ ‘বিচিত্রা’ পত্রিকায় ‘নন্দলাল বসু’ শীর্ষক বহুল আলোচিত প্রবন্ধটি লেখেন। নন্দলাল বসু প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ উল্লেখ করেন,
“.....নিকটে থেকে নানা অবস্থায় মানুষটিকে ভালো করে জানবার সুযোগ আমি পেয়েছি। এই সুযোগে যে মানুষটি ছবি আঁকেন তাঁকে সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা করেছি বলেই তাঁর ছবিকেও শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করতে পেরেছি। এই শ্রদ্ধায় যে দৃষ্টিকে শক্তি দেয় সেই দৃষ্টি প্রত্যক্ষের গভীরে প্রবেশ করে। নন্দলালকে সঙ্গে করে নিয়ে একদিন চীন জাপানে ভ্রমণ করতে গিয়েছিলুম। আমার সঙ্গে ছিলেন আমার ইংরেজ বন্ধু এলমহার্স্ট। তিনি বলেছিলেন, নন্দলালের সঙ্গ একটা এডুকেশন। তাঁর সেই কথাটি একবারেই যর্থাথ। নন্দলালের শিল্পদৃষ্টি অত্যন্ত খাঁটি, তাঁর বিচারশক্তি অন্তদর্শী। ..... শিল্পী ও মানুষকে একত্র জড়িত করে আমি নন্দলাকে দেখেছি। বুদ্ধি হৃদয় নৈপূণ্য অভিজ্ঞতা ও অন্তদৃর্ষ্টির এ রকম সমাবেশ অল্পই দেখা যায়....”।
১৯৩৪ সালে শান্তিনিকেতনে ‘শ্রাবণ-গাথা’র প্রথম অভিনয় উপলক্ষে প্রকাশিত স্মারক পুস্তিকার প্রচ্ছদ আঁকলেন নন্দলাল।
১৯৩৫ সালের ২৮ মার্চ প্রতিমা দেবীকে শান্তনিকেতন হতে রবীন্দ্রনাথ জানাচ্ছেন, “আমার মেটে কোঠার ছাদ আরম্ভ হয়েছে। নন্দলাল’রা রোজ একবার করে এসে ওর সামনে দাড়িয়ে ধ্যান করে যান”। কবির শেষ জীবনের বাড়ী ‘শ্যামলী’র নির্মাণে ভাস্কর্যের দায়িত্ব পাওয়া নন্দলাল এবং স্থাপত্য পরিকল্পনায় সুরেন্দ্রনাথের কর্মকাণ্ডের ইঙ্গিত করা হয়েছিল।
১৯৩৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে নন্দলাল ঠরংাধ-ইযধৎধঃর ছঁধৎঃবৎষু-তে ঞযব চধরহঃরহম ড়ভ জধনরহফৎধহধঃয শিরোনামে একটি মূল্যবান প্রবন্ধ লেখেন। লেখাটিতে নন্দলাল এক পর্যায়ে উল্লেখ করেছিলেন,
‘ডযবহ ও ংধরফ ঃযধঃ জধনরহফৎধহধঃয’ং ধৎঃ রং ৎবধষ, ঃযড়ঁময হড়ঃ ৎবধষরংঃরপ. ও ধিং পড়হংপরড়ঁং ড়ভ যধারহম বীঢ়ড়ংবফ সুংবষভ ঃড় ঃযব পযধষষবহমব ঃড় ফবভরহব যিধঃ বীধপঃষু ও সবধহঃ নু ‘ৎবধষ’ ... ও ধস রিষষরহম ঃড় ধফসরঃ, ঃযবৎব রং ধহ বষবসবহঃ ড়ভ ঃযব পঁৎরড়ঁং ধহফ বাবহ ড়ভ ঃযব মৎড়ঃবংয়ঁব ধনড়ঁঃ জধনরহফৎধহধঃয’ং ঢ়রপঃঁৎবং, ঃযবৎব রং ংড় সঁপয ড়ভ ‘ৎবধষ’ রহ ঃযবস ঃযধঃ ঃযব ধঃঃবহঃরড়হ রহংঃবধফ ড়ভ বিধৎুরহম মধরহং রহ রহঃবহংরঃু ধহফ রহ ঁহফবৎংঃধহফরহম...’
এর অনেক পরে ১৯৪১ সালের ২৩ জুন বিশু মুখোপাধ্যায়কে লেখা এক চিঠিতে এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ জানিয়েছিলেন, “অল্পদিন হলো, নন্দলাল যখন আমার চিত্রকলা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন, আমি তার সম্পূর্ণ অর্থ গ্রহণ করতে পারিনি”। তবে এটাও জানা সম্ভব হয়নি কোন কোন প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ভিন্নমত পোষণ করেছিলেন। তবে নন্দলালের ইংরেজী প্রবন্ধটি রবীন্দ্রনাথের চিত্রশৈলী সম্পর্কে অনেক নতুন তথ্যের যোগন দিয়েছিলো সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই।
ছয়।
১৯৩৭ সালের এপ্রিলে আলমোড়া’য় যাবার সময় নন্দলালের অনেকগুলো স্কেচ  কবি সঙ্গে নিয়ে যান। সেই ছবিগুলোর অনুপ্রেরণায় প্রকাশিত হলো ‘ছড়ার ছবি’। এর বত্রিশটি কবিতাই লেখা হয় নন্দের আঁকা আটত্রিশ’টি ছবি অবলম্বনে। মুখ্যত চিত্রী নন্দলানেরর প্রতি কবি রবীন্দ্রের সবিশেষ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার প্রমাণ স্বরূপ ‘ছড়ার ছবি’ বিশেষ স্থান দখল করে আছে। এর প্রতিটি কবিতার পেছনে নন্দলালের আঁকা ছবিগুলোর স্বতন্ত্র ইতিহাসও রয়েছে। যেমন, ‘মাধো’; ‘অচলাবুড়ি’; ‘সুধিয়া’; ‘দেশান্তরী’ কবিতার পেছনে ছিল আলমোড়া যাত্রার প্রাক্কালে কলকাতা এবং সেই অঞ্চলের পাটকল ধর্মঘট জড়িত ছিল। কিছুকাল পরে নন্দের কয়েকটি রেখাচিত্র অবলম্বনে এই ধর্মঘটী শ্রমিকদের প্রতি কবির মমত্ব ছাড়াও ‘ছড়ার ছবি’ কাব্যগ্রন্থের ‘ছবি আঁকিয়ে’ কবিতাটি নন্দলালকে উদ্দেশ্য করে কবি লিখেছেন,
“ছবি আঁকার মানুষ ওগো পথিক চিরকেলে
চলছ তুমি আশে পাশে দৃষ্টির জাল ফেলে”।
কিংবা ...
“ওগো চিত্রী, এবার তোমার কেমন খেয়াল এ যে
এঁকে বসলে ছাগল একটা, উচ্চশ্রবা ত্যেজে”।
উল্লেখ্য, ১৯৩৯ সালে কলকাতায় সাহিত্য পরিষৎ-এর হলঘরে সপ্তাহব্যাপী চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। এই প্রসঙ্গে নন্দলাল চিঠির মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথকে অবহিত করেছিলেন রবীন্দ্রনাথের ছবির ব্যাপারে।
১৯৪১ সালে নন্দলালের আঁকাসহ ‘সহজপাঠ’ এর তৃতীয় ও চতুর্থ ভাগ প্রকাশিত হল। কাজগুলো ছিল কাগজে ব্রাশ ও কালির প্রলেপে। সহজপাঠ-এর তৃতীয় ভাগে ‘বর্বর’ কবিতাটি অলংকরণে একটি বিশেষত্ব লক্ষ্য করা যায়। এটিই একমাত্র রবীন্দ্ররচনা যা চিত্ররূপ পেয়েছে যথাক্রমে ‘সহজপাঠ’-এ নন্দের এবং ‘খাপছাড়া’য় রবীন্দ্রনাথের নিজের তুলিতে। নন্দলাল তখন কলাভবনের অধ্যক্ষ। আঁকাগুলো রবীন্দ্রনাথ খুব পছন্দ করেছিলেন। সেই বছরই আষাঢ় মাসে কবির লেখা ‘আশ্রমের রূপ ও বিকাশ’ বইটি প্রকাশিত হল। এটি রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় প্রকাশিত সর্বশেষ গ্রন্থ। যার চিত্রকর ছিলেন যথারীতি নন্দলাল বসু। বইটিতে শান্তিনিকেতন আশ্রমের কয়েকজন বিশিষ্ট শিক্ষকের প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ আলোচনা করেছেন। নন্দলাল প্রসঙ্গে কবি লেখেন, “আশ্রমের সাধনা ক্ষেত্রে দেখা দিলেন নন্দলাল। ছোট বড় সমস্ত ছাত্রের সঙ্গে এই প্রতিভাসম্পন্ন আর্টিস্টের একাগ্রতা অতি আশ্চর্য। তাঁর আতœদান কেবলমাত্র শিক্ষকতায় নয়, সর্বপ্রকার বদান্যতায়”।
১৯৪১ সালে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর বিভিন্ন রবীন্দ্ররচনার গ্রন্থচিত্রণে নন্দলাল অব্যাহতভাবে এঁকে চললেন।
১৯৪২ সালে শান্তিনিকেতনের চীনা ভবনের জন্য আঁকলেন ‘নটীর পূজা’র ফ্রেস্কো (২৮.৫ বাই ৪৮ ইঞ্চি)। পরের বছর আবার ‘নটীর পূজা’ আঁকলেন গুয়াশ পদ্ধতিতে বরোদা’র কীর্তি মন্দিরের ভিত্তিচিত্র হিসেবে। যদিও ১৯৩৯ সালে এ কাজে তিনি হাত দিয়েছিলেন।
১৯৫২ সালের সিল্কের উপর ব্রাশ ড্রইং (২৬.৪ বাই ৪৫.৮ সেমি) পদ্ধতিতে আঁকলেন ‘চণ্ডালিকা’। ১৯৫৪ সালে ‘চিত্রবিচিত্র’ গ্রন্থের ইলাস্ট্রেশন। ১৯৫৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর ‘খৃষ্ট’ কবিতার। একই বছর রবীন্দ্র-জন্মশত বার্ষিকী সংস্করণ উপলক্ষে ‘শিশু’ গ্রন্থে বীরপুরুষ কবিতাটির ইলাস্ট্রেশন। ১৯৬২ সালের ৮ মে বিশ্বভারতী হতে প্রকাশিত রবীন্দ্ররচনা ‘বীরপুরুষ’ নন্দলাল ও তাঁর ছাত্র সুখেন গাঙ্গুলীর চিত্রসহ গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হল। সম্ভবত রবীন্দ্র গ্রন্থচিত্রনে এটিই নন্দলালের শেষ আঁকা। এর আগে ১৯৫১ সালে তিনি কলাভবন হতে অবশেষে অবসর নিলেন।
১৯৫২ সালে বিশ্বভারতী নন্দলালকে ‘দেশিকোত্তম’ উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৫৩ সালে পান ভারত সরকার কর্তৃক ‘পদ্মবিভূষণ’ পদক। ১৯৫৭তে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১৯৬৪ সালে এশিয়াটিক সোসাইটি তাঁকে ‘রবীন্দ্র শতবর্ষ পদক’ প্রদান করে।
১৯৬৬ সালের ১৬ এপ্রিল নন্দলাল বসু’র মহাপ্রয়াণ ঘটে।

শেষ কথা
রবীন্দ্রনাথের প্রসঙ্গে নন্দলালের উপরোক্ত আলোচনাটি অনেকাংশে সারগর্ভমূলক না হয়ে তথ্য ও উদ্ধৃতি-নির্ভর হয়ে পড়ায় কতটুকু বিষয়চ্যূত হয়ে পড়লো তা পাঠকমাত্রই ভালো বুঝবেন। তবে লেখাটির শিরোনাম ‘রবীন্দ্রনাথের নন্দলাল’-এর পরিবর্তে ‘নন্দের রবীন্দ্র’ হলেও পর্যায়ক্রমিক তখ্যাবলী একইভাবে সন্নিবেশিত করতে হতো। বলে রাখা ভালো, নন্দলাল ও রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কিত অনেক মূল্যবান তথ্য হয়তো তুলে ধরা সম্ভব হয়নি। কিছু ঐতিহাসিক ঘটনাবলীতেও বয়ানের তারতাম্য ঘটতে পারে। যেমন, তথ্য ঘাঁটতে গিয়ে জানা গেছে, ১৯২৭ সালে আদৌ নন্দলাল বালি দ্বীপে রবীন্দ্রনাথের সফরসঙ্গী ছিলেন না। অথচ সন্দীপ সরকার সূত্রে (দেশ, বিনোদন ১৩৮৯) বালি যাত্রার এই তথ্যটি পাওয়া গেছে। আবার বালি দ্বীপ হতে ৭ সেপ্টেম্বর পুত্র রথীন্দ্রনাথকে লেখা চিঠিতে কবিকে বলতে শুনি,
“নন্দলাল এখানে এলেন না বলে আমার মনে অত্যন্ত আক্ষেপ বোধ হয়”।
কবির সাথে এই চিত্রীর পারস্পরিক সম্পর্কের দর্শনজাত বোধ, সবোর্পরি সাহচর্যের পরম্পরা রক্ষা করাবার উদ্দেশ্যেই তথ্য ও উদ্ধৃতির আশ্রয় নেয়া।
চিত্রকলার নিজস্ব ভাষা আয়ত্ত্ব করতে রবীন্দ্রনাথ শুধু নন্দলালের কাছেই এককভাবে প্রেরণা পাননি, বরং সমসাময়িককালের বিভিন্ন চিত্রশিল্পীবৃন্দ এবং এমনকি ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো (যাকে তিনি বিজয়া ডাকতেন) পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের শিল্পী সত্তাকে গুরুত্বের সাথে উপলদ্ধি করেছিলেন। এখানে নন্দলালের প্রসঙ্গ ভিন্ন দৃষ্টিকোণ হতে বলবার উদ্দেশ্য অন্যত্র। শিল্পকলায় নন্দলালের ছিল ব্যতিক্রমী স্বাতন্ত্র্য। যার ধারাবাহিকতায় আধুনিক চিত্রশৈলীর আবির্ভাবে পৌণঃপুনিকভাবে প্রাচ্য শিল্পরীতির সাথে দেশজ শিল্পভাষা এবং পাশ্চাত্যের যোগসূত্র স্থাপনে তিনি একান্ত সক্ষমতা অর্জন করতে পেরেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ সেই সম্ভাবনাকে নন্দলাল সূত্রে প্রবলভাবে আত্তীকরণ করতে সমর্থ হয়েছিলেন। অনুঘটক ছিলেন নন্দলাল বসু। শিল্পে স্বাদেশিকতার ভিন্ন মাত্রা আবিষ্কারে নন্দলালের শিল্পদর্শন রবীন্দ্রনাথকে গভীরভাবে ভাবিয়েছিল। এই তুলনামূলক সংশ্লিষ্টতাকে চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন সত্যজিৎ চৌধুরী। তাঁর মতে,
 ‘রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিয়ে বাঙলা কবিতায় আধুনিকতার বিচার অর্থহীন হয়ে পড়ে, তেমনি নন্দলালের পর্বে পর্বান্তরে বিস্তৃত কাজের সমীক্ষা এড়িয়ে ভারতীয় আধুনিকতার ধারণা দাঁড় করানো যায় না’। এই বক্তব্যের পক্ষে যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে। অন্তত রবীন্দ্র-নন্দলাল জুটির ক্ষেত্রে সাহিত্য-শিল্পকীর্তি গভীরভাবে তলিয়ে দেখলে এ’ সত্য কিছুটা অনুমান করা যেতে পারে।
রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর শিল্পগুরু অবনীন্দ্রের মতো নন্দলালও কল্পনা করেছিলেন একটি বিশেষ ছবি আঁকবেন গুরুদেবের চলে যাওয়াকে কেন্দ্র করে । অনন্ত সমুদ্রে গুরুদেবকে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে - ঢেউয়ের মাথায় একটি পদ্মফুল - জনতার ঢেউয়ের উপর দিয়ে মাথার ওপর দিয়ে পদ্মফুলটি ভেসে যাচ্ছে ...। কিন্তু আগেই অবনীন্দ্রনাথ ‘ভাসাও তরণী, হে কর্ণধার’ - শিরোনামে একটি ছবি এঁকে ফেলেছিলেন। সুতরাং নন্দলাল আর আঁকলেন না কিছু। তাঁর হয়তো ক্ষণে ক্ষণে সেদিন মনে পড়ছিলো গুরুদেব মৃত্যুর কয়েক মাস আগে ১৯৪০ সালের ৩ ডিসেম্বর তাঁকে উদ্দেশ্য করে লিখে গিয়েছিলেন,
কল্যাণীয় শ্রীযুক্ত নন্দলাল বসু,
রেখার রহস্য যেথা আগলিছে দ্বার
সে গোপন কক্ষে জানি জনম তোমার।
সেথা হতে রচিতেছ রূপের যে নীড়,
মরুপথ শ্রান্ত সেথা করিতেছে ভীড়।
১২ ডিসেম্বর ১৯৪০ সালে নন্দলালের জন্মদিনে রবীন্দ্রনাথের এই অর্ঘ্য বানীটিই ছিল যথেষ্ট। দুই মহান শিল্পীর পারষ্পরিক সম্পর্কের অপার্থিব বাঁধনটি বারবার অনুধাবন করবার জন্য এর চেয়ে বড় নিদর্শন আর কি হতে পারে!
শিল্প-সাহিত্যের এমন জুটি দেশ-কাল-পাত্রের বিচারে নিশ্চয় বিরল।