মুক্তিযুদ্ধ
যুদ্ধগাথা একাত্তর
এনায়েত কবীর
গুলির গন্তব্য থেকে
লুৎফুল হোসেন

প্রবন্ধ
চিত্রকর কমলকুমার মজুমদার
শেখ মিরাজুল ইসলাম

গল্প
মোজাফ্ফর হোসেন
সাদিয়া সুলতানা
আবু নাসের

নিবন্ধ
বিলেতে মিশুক মুনীরের সঙ্গে
শাকুর মজিদ

উপন্যাস
রূপে তোমায় ভোলাবো না
সৈয়দ আনওয়ারুল হাফিজ

গদ্য
বিজ্ঞাপনের ভাষা
নাজিব তারেক

বিশ্বসাহিত্য
মার্কেজ ও ক্যাস্ট্রো
লিওনার্ড কোহেন
আকিল জামান ইনু

বিশেষ রচনা
হোমারের জন্য প্রশস্তিগাথা
অনুবাদ: মাসরুর আরেফিন

সমকালীন ইতালিয়ান ফিকশন
সোহরাব সুমন

শ্রদ্ধাঞ্জলি
 সৈয়দ শামসুল হক

জীবনকথা
প্রজন্ম নক্ষত্র
রুখসানা কাজল

ভ্রমণ
হোটেল ডে আর্টস
মঈনুস সুলতান

টরন্টোর চিঠি
শামীম আহমেদ

অস্ট্রেলিয়ার চিঠি
ফজল হাসান

এবং
গুচ্ছ কবিতা
নাহার মনিকা

৯ বর্ষ ৯ সংখ্যা
এপ্রিল ২০১৭

লেখক-সংবাদ : প্রতি রাতে তাঁর সঙ্গী কবিতা, আর দিনমান দুনিয়ার তাবৎ কবির ঠিকুজি সন্ধানে রত ওমর শামস * মন সরানোর জো নেই হাবীবুল্লাহ সিরাজীর নয়া কিতাব ‘জো’ থেকে * একজন কমলালেবু নিয়ে বইমেলায় আসছেন শাহাদুজ্জামান; তাঁর অপর গ্রন্থ ‘ইলিয়াসের সুন্দরবন ও অন্যান্য’ * ফরিদ কবিরের ‘জীবনের গল্প’ লেখ্যরূপে বারবার বদলে চলেছে * রাশিয়ার ইতিহাস খুঁড়ে মশিউল আলম এঁকে চলেছেন ‘লাল আকাশ’, কমপক্ষে ৫০০ পৃষ্ঠার উপন্যাস হবে এটি * দারুণ সব অর্জন এলেও বছরভর শ্র“তিযন্ত্র যন্ত্রণা করেছে শাহীন আখতারের, এরই মাঝে ঘটে চলেছে ‘স্মৃতির ছায়াপাত’* নির্বাচিত গল্প সংকলনের কাজ গোছানো শেষ রাশিদা সুলতানার * ফারহানা মান্নানের ভিন্নধর্মী বই ‘একুশ শতক ও অন্য শিক্ষার সন্ধানে’ বইটি প্রকাশ করছে আদর্শ * হাসানআল আব্দুল্লাহর কবিতার জন্য হোমার ইয়োরোপিয়ান মেডেল প্রাপ্তি এবং চীন সফরÑ দুটোই দারুণ খবর * ফয়জুল ইসলাম নতুন গল্পের মুখ দেখছেন ‘আয়না’-য় * জোড়া কাব্য নিয়ে মেলায় ঢুকবেন ইমতিয়াজ মাহমুদ *





সমকালীন ইতালিয়ান ফিকশন
সোহরাব সুমন
সমকালীন ইতালিয় কথাসাহিত্যের বেশিরভাগ লেখা ছাপা হয় ইতালিয় এবং ইউরোপিয় ইতিহাসের সামাজিক, রাজনৈতিক নাটকীয় সব পট পরিবর্তনের সময়। সত্তরের দশকের অব্যাহত সন্ত্রাস, আশি’র রাজনৈতিক দূর্নীতি আর অর্থনৈতিক বৈভবের স্বর্নযুগ পেরিয়ে নব্বুই দশকের ডিকন্সট্রাকশন-এর পুরোটা সময়ই ইতালি ছিল ভীষণ রকমের গোলযোগ প্রবণ একটি জাতি, দেশটি তার দ্রুত এবং নাটকীয় আধুনিকায়নের সময়েও পুরোপুরি অতীত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়নি। সেখানকার সমকালীন কথাসাহিত্য তথা ফিকশন তাদের সামাজিক, রাজনৈতিক, সমকালীন সংস্কৃতিক এবং পরিবেশগতসহ আকস্মিক সব পরিবর্তনের স্মারকÑ যুদ্ধপরবর্তী কালেও যা হুবহু অনুসৃত হয়ে আসছে। সঙ্গে, আশির যৌথস্বপ্ন এবং ঠাণ্ডাযুদ্ধের আদর্শকে জনজীবনের অত্যন্ত গভীর এক মোহমুক্তি, আমূল সংস্কারকামিতা, এবং তথাকথিত ইতিহাসের দ্বারা স্থলাভিষিক্ত হতে দেখা যায়।
প্রথমে, রেনেসাঁ যুগে ইতালির অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অতি প্রসারের ঘটে। সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার মাঝে সেখানকার শহর আর নগরগুলো ব্যবসা বাণিজ্য এবং শিল্প কলকারখানার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়। যবর দখল আর নিজস্ব প্রভাব প্রতিপত্তির মাধ্যমে ক্ষমতার বলয় বাড়াতে শহরের নেতারা অনবরত আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে। ঘটনাক্রমে, ভেনিস এবং জেনোয়ার মত কিছু কিছু নগর রাজ্য ভূমধ্যসাগরীয় সা¤্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ অর্জন করে। সে সময়, প্রাচীন অনেক পা-ুলিপির আবিষ্কার, এবং চিরায়ত সাহিত্য ও দর্শনের পুনঃমূল্যায়নের মাধ্যমে সংস্কৃতির পুনর্জন্মের জন্য এই যুগটি বিশেষ ভাবে চিহ্নীত হয়ে আছে, ঘটনাক্রমে এধরণের কর্মকা- সমস্ত ইউরোপ জুড়েই বিস্তৃতি লাভ করে। রেনেসাঁপূর্ব অনেক লেখক গ্রীক এবং ল্যাটিন চিরায়ত সাহিত্যের অনুবাদ এবং দর্শনের গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন। এরা সবাই মানবতাবাদী হিসেবে পরিচিত, কেননা আরসব অতিজাগতিক আদর্শের বদলে তারা মানুষের প্রতি আগ্রহী থেকেই মধ্যযুগীয় জ্ঞানী গুণী এবং চিন্তাবিদদের বিরোধিতা করে গেছেন। মধ্যযুগীয় প্রেরণা এরিস্টটলের বদলে এইসব মানবতাবাদীরা তার গুরু প্লেটোর সৃষ্টিকর্মের দ্বারা অনুপ্রাণিত হন।
স্বাধীনতা এবং একত্রীকরণ ১৩ শতক থেকেই ইতালির লেখকদের বহুদিনের আশা। অনেক বিকল্পসহ ইতালিয় সাহিত্য উন্নয়নের মাধ্যমে এই জাতীয়তাবাদকে ক্রমেই সুস্পষ্ট করা হয়। তখন থেকে বর্তমান পর্যন্ত ইতালিয়ান ভাষায় ইতালিয় সাহিত্য চর্চা অব্যহত রয়েছে। আগে এই ভাষা ছিল ল্যাটিন। লিপিবদ্ধ ঘটনাপঞ্জি, ঐতিহাসিক কাব্য, বীরগাঁথা, সাধু সন্ন্যাসীদের জীবনী, ধর্মীয় কাব্য, নীতিশিক্ষা এবং বৈজ্ঞানিক কাজকারবার এসবÑই ছিল তাদের লেখালেখির বিষয়। তখনকার কিছু কবি প্রাদেশিক ভাষায় লিখতেন, তাদের বেশীর ভাগের শ্লোকের আঙ্গিক বিষয়বস্তু ছিল বাইরে থেকে আমদানি করা। মধ্যযুগের পদ্যের ধরন ছিল স্থানীয় প্রেমগীত। আর্থারিয়ান নাইট শার্লমেন এবং তার সহচর প্রাচীনসব বীরদের কাজকারবার এসব সাহিত্যে ঠাঁই পায়। ফ্রাঙ্কো-ভেনিসিয় স্থানীয় ভাষায় প্রথমে শার্লমেন কাহিনি লেখা হয়, পরে অনুবাদের মাধ্যমে তুসকানিয় ভাষায় এসবের ইতালিয় রূপ দেয়া হয়। লোকপ্রিয়তার খাতিরে এসব গল্প নিয়ে তখনকার দিনের স্থানীয় সমকালীন কবিরা অঢেল শিভলরিও রচনা করে। ফরাসী বিপ্লব ইউরোপ জুড়ে জাতীয়তাবাদের যে উত্তাপ ছড়ায় তাতে স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ১৯ শতকের শুরু থেকে ১৮৭০ সালের আগপর্যন্ত, রোম থেকে ফরাসি সৈন্য প্রত্যাহারের মাঝ দিয়ে বিদেশী প্রভাবের সবশেষ চিহ্নটুকুও অপসারিত হলে, সাহিত্যসহ ইতালিয় জীবনধারার সর্বত্র জাতীয়তাবাদের প্রভাব সুস্পষ্ট হয়। বিংশ শতাব্দীতে এসে ইতালিয় সাহিত্য আরো অনেক বৈচিত্র্যময় ফর্ম এবং বিষয়ের সাথে পরিচিত হয়। যার বেশির ভাগই স্বৈরাচার মুসোলিনির দীর্ঘ শাসনের প্রতিফলন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সামাজিক বাস্তবতা সেখানকার কবিতা এবং গদ্যে গভীর প্রভাব ফেলে। এসময়কার ইতালিয় সাহিত্য ফিকশন এবং ছোটগল্প নির্ভর। ইতিহাসের পথ পরিক্রমায় সেখানকার প্রতিটি প্রজন্মের লেখকেরা সাহিত্যের এই বিশেষ ধারাটি নিয়ে কাজ করে গেছেন। আন্তর্জাতিক এবং আভ্যন্তরীণ অব্যহত রাজনৈতিক পট পরিবর্তন, আর্থসামাজিক পরিস্থিতি, ইতিহাস ঐতিহ্যসহ লেখকদের লিঙ্গ, জন্মস্থান, বংশ পরিচয় পর্যন্ত এক্ষেত্রে সমান প্রভাব বিস্তার করেতে দেখা যায়।
সম্প্রতি আমরা যে বিশে^ বসবাস করছি তা আপনা থেকে নতুন নতুন সব প্রতিবেশ আর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে, এর সীমানা এবং গঠনের পরিবর্তন করে মানানসই কোন আদলে নিজেকে আবারও এঁকে নিচ্ছে, হোক তা প্রাকৃতিক, সামাজিক, বা কাল্পনিক। আমরা সবাই যে জগতের বাসিন্দা সেই স্থান এবং কালের সমান্তরাল র্ভাচুয়াল জগতের একজন মাচিত্রকর হিসেবে ইতালিয় লেখকদের রূপক সতন্ত্র এমন একটি শতাব্দী শেষের সৃষ্ট কথাসাহিত্য সম্পর্কে আলোচনা প্রবণ, ইতালো ক্যালভিনো’র ভাষায়, “তা আধুনিক পশ্চিমা ভাষা সমূহের জন্ম এবং উন্মেষ দেখেছে, এবং সেই সব সাহিত্যও যা এইসব ভাষার সম্ভাব্য ভাব, বিজ্ঞতা এবং কল্পনাপ্রবণতা আবাহন করেছে।” সেই বিস্তৃত শৈলী এবং বৈচিত্রময় সব স্বরবিভেদ ছাড়াও এসময়কার ইতালিয় লেখকেরা নিজ নিজ লেখার মাঝে তাদের রাজনৈতিক একত্রীকরণের সময়কার এমন আদর্শ আগেকার সব বাগধারা সংগ্রহ করেছেন যার বেশীরভাগই বর্তমানে সেখানকার লেখ্য বা কথ্য ভাষায় ব্যবহৃত হয় না। সেই ভাষা সৃষ্টির দেড়শত বছর অতিবাহিত হলে এবং রেডিও, সিনেমা, এবং টেলিভিশন আসার পর, ইতালির জন্য ভাষাতাত্ত্বিক একত্রীকরণ এক প্রকার অর্জিত একটি সত্যে পরিণত হয়। এমন একটি লক্ষ্যের উপলব্ধি তাদের বহুআগেকার সাহিত্যিক অভিজাতেরা দান্তে আলিগিয়েরি’র ১৩০৩Ñ৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে রচিত দ্য ভালগারি ইলোকোয়েন্টা এর মতো মহান সব সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে নির্দিষ্ট করে গেছেন। যে সময় কথ্য ইতালিয় সন্দেহাতীতভাবে সেখানকার আঞ্চলিক ভাষা সমূহের স্থলাভিষিক্ত হয়। এখনও পর্যন্ত ইতালিয়ানেররা তাদের পরবার-পরিজন, বন্ধুবান্ধব এবং স্বল্পপরিচিতের সঙ্গে ইতালিয় ”জাতীয়” এবং স্থানীয় ভাষায় পালা করে কথা বলে। একটি সংস্কৃতিবান অভিজাতদের প্রকাশভঙ্গি সমেত শতাব্দী জুড়ে প্রাথমিকভাবে ইতালিয় ছিল লেখ্য একটি ভাষা। কথাটি খুব বেশি দিন সত্য হিসেবে থাকতে পারেনি। তবে সমালোচক লিনো পেরতিলে’র পর্যবেক্ষণ অনুসারে, “অডিও ভিজ্যুয়াল যোগাযোগ মাধ্যমের প্রচলনের আগপর্যন্ত এর লেখ্য শব্দগুলোও প্রচলিত ইতালিয় সংস্কৃতির বলয়ে নিজেদের সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি।” পরিণতিতে ইতালিয় লেখকেরা তুলনামূলকভাবে এখনও ইতালিয় ছোট্ট একটি সংখ্যলঘু পাঠক সমাজের জন্য তাদের লেখাগুলো লিখে চলেছেন বলে ধরে নেয়া যায়। এটিসহ আরো অনেক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলা যায়, ১৯৭৬ সালটি সাম্প্রতিক ইতালিয় ইতিহাসের মাঝে একটি জলছাপের প্রতিনিধিত্ব করছে। বছরটি ইতালিয়ান বেতারতরঙ্গের দাপ্তরিক নিয়ন্ত্রণহীনতা প্রত্যক্ষ করেছে। একজন সিনেমা বোদ্ধা হিসেবে এসম্পর্কে মিল্লিসেন্ট মার্কস লিখেছেন, “এটি ইতালিকে একটি টেলিভিজ্যুয়াল মাতামাতির মাঝে নিয়ে গিয়ে,” সিলভিও বার্লেস্কুনি’র মতো মিডিয়া টাইকুনদের জন্য রাজনৈতিক উত্তোরণের পথ প্রস্তুত করে। এই অডিওভিজ্যুয়াল বিপ্লব সংস্কৃতিক আভিজাত্যের পুরাতন উভয়-সঙ্কটের মতো দোটানা পরিস্থিতি বিলোপে সহায়তা করে, এভাবেই এখনকার ইতালিয় সাহিত্য সেখানকার টেলিভিশনের আগ্রাসী ”জাতীয়-প্রচলিত” ভাষার বিরুদ্ধে গিয়ে এর নিজস্ব এলাকাটিকে সুরক্ষিত করে টিকে রয়েছে। আগে যেমনটা ছিল, সেই কথ্য এবং লেখ্য ভাষার মিলন এখন আর ইতালিয় লেখকদের শৈলীগত মূল ভাবনা নয়। যদিও সুর্নিদিষ্ট করে বলতে গেলে, জোভান্নি ভেরগা (১৮৪০Ñ১৯২২), কার্লো এমিলিও গাদ্দা (১৮৯৩Ñ১৯৭৩), বা পিয়ের পাওলো প্যাসোলিনি (১৯২২Ñ৭৫) আলাদা আলাদা প্রজন্ম সমূহের জন্য এই ফলাফলগুলো খুবই ভিন্ন রকমের ছিল। তবু এর্রি দ্য লুকা এর সম্প্রতিক বিখ্যাত ছোটগল্প মন্তেদিদিও এর মতো এখনও সেখানকার আঞ্চলিক এবং জাতীয় ভাষার মধ্যকার বর্ণনাধর্মী টান অত্যন্ত বেশি মাত্রায় দেখতে পাওয়া যায়, বিশেষ করে দক্ষিণ ইতালিয় লেখকদের মাঝে। তাদের ভেতরকার এই ভঙ্গীল ভাষিক এবং সাহিত্যিক পরিচয় এখন আরো বড় পরিসরে দেখতে পাওয়া যায়। উনিশ শতকের সবচাইতে প্রভাব সৃষ্টিকারী উপন্যাস আই প্রোমেস্সি স্পোসি (বাগদত্তা) এর লেখক ঔপন্যাসিক আলেসান্দ্রো ম্যানজোনি (১৭৮৫Ñ১৭৮৩), যদি “আরনো নদী অববাহিকাতে তার ভাষিক টুকরোগুলোকে খুঁজবার আশা নিয়ে,” আজকের ফ্লোরেন্সের পোন্তে ভেক্কহিও তে ফ্লোরেনটাইন স্থানীয়দের মাঝে ফিরে আসেন তাহলে তিনি বরং ইতালি, আমেরিকান ইংরেজি, জার্মান, স্প্যানিশ এবং জাপানির মিশেলে বেসুরো অশুদ্ধ মিশ্রিত একটি ইতালিই শুনতে পাবেন।” সুদীর্ঘ অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে, ইতালি এখন জনপ্রিয় একটি গন্তব্যÑ শুধুমাত্র ফ্রান্সিস মায়ার এর তুসকান সান এবং বেল্লা তুসকানি এর মতো বইগুলোর বর্ণনার মাঝে চিত্রিত সেখানকার অতিসাম্প্রতিক সংস্কৃতিক পর্যটনের চুড়ান্ত “ভার্চুয়াল” পল্লী দৃশ্য থেকেও তা আন্দাজ করা সম্ভব। অনেকটা নিশ্চিত করেই বলা যায়, সেখানকার পথ-ঘাট, হাঁট-বাজারগুলো চষে বেড়িয়ে বিদেশি ক্রেতারা দেশটির জুয়েলারি, চামড়ার তৈরি পণ্য, স্কার্ফ, জুতো বা বিশেষ কোন স্মৃতিচিহ্ন সংগ্রহের আশায় সেখানকার কারিগর, ব্যবসায়িদের কাছে ঢুমারবার সময়ও হয়তো এখনও তাদের মুখে ফ্লোরেনটাইন বাচনভঙ্গি শুনতে পাবেন। কিন্তু মাঝেমধ্যেই তাতে আফ্রিকান ভাষার মিশেল বা অভিবাসী কোনো ফেরিওয়ালার কথা শুনতে পাওয়া যাবে। এবং অভিবাসী সম্প্রদায়গুলো ইতালিতে শেকড় গাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে নতুন একটি “অভিবাসী সাহিত্যেরও” আর্বিভাব ঘটেছে। এবং এটাই স্বাভাবিক। সংক্ষেপে বলতে গেলে, ইতালি বিশ^ায়নের যুগে প্রবেশ করতে শুরু করলে; এর নিরিখে সেখানকার গল্পকারেরাও এর মাঝ থেকে তাদের লেখার রসদ আর উপাদান সংগ্রহ করতে শুরু করে।
ইতালিয় লেখক এবং পাঠক বিশেষ করে সেখানকার তরুণ প্রজন্মের পাঠকদের মাঝ থেকে স্থানীয় ইতালিয় (সিসিলিয়ান বা নিয়াপলিটান নয়) ভাষায় কথা বলিয়েদের সংখ্য ক্রমেই বাড়ছে। তবে তারাও অন্যসব সমসাময়িক ব্যক্তিবর্গের মতো বিশি^ মিডিয়া সংস্কৃতির লিঙ্গুয়াফ্রাঙ্কা দ্বারা বিধৌত। সত্যি করে বলতে গেলে, আমদানিকৃত ভাষিক এবং সব ধরণেন সংকরায়ণের প্রভাবে, সেখানকার স্থানীয় বাগধারা সমূহ ক্রমেই আরো বেশি বেশি দূষণের শিকার হচ্ছে। কেউ কেউ একে নির্জলা দূষণ বলেই স্বীকার করে থাকেন। যদিও স্ববিরোধী মনে হবার পরও প্রকারান্তরে বিশ^ায়নের এই প্রভাবের মাধ্যমে তাদের ভাষাটিই সমৃদ্ধ হচ্ছে। এক্ষেত্রে একটি যুতসই উদাহরণ হিসেবে ইদানিংকালের ইতালিয় র‌্যাপ মউিজিকের কথা বলা যেতে পারে। সম্প্রতি, র‌্যাপ সঙ্কলন, পোতেরে এল্লা প্যারোলা (শব্দের শক্তি) পাঠে সেখানকার বিখ্যাত র‌্যাপার জোভানেত্তি’র সঙ্গে পরিচিত হওয়া যাবে এবং সঙ্গে “লা মিউজিকা দেল্লা রাজ্জা উরবানে” (পল্লীর লোকেদের গান) শিরোনামের প্রবন্ধ পাঠেরও সুযোগ মিলবে। জোভানেত্তি’র মতে, এই র‌্যাপ সঙ্গীত স্থানীয় ভাষিক সংস্কৃতিÑ ইতালিয় উপদ্বীপের বিভিন্ন এলাকার লেখ্য-রূপের অন্তর্ভুক্ত বেশিরভাগ আঞ্চলিক ভাষাÑ এবং ট্রন্সনেশনাল শহুরে ছন্দের মাঝে সেতুবন্ধ স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
বিশ^ায়নের এরকম চোখে পড়ার মতো আরেকটি ঘটনা হলো বিশ^সাহিত্য মানচিত্রের জনসংখ্যাগত বিকেন্দ্রীকরণ। সত্য বর্জিত নয় বলেই বলতে হচ্ছে, এক সময় কেবল এলাকা ভীত্তিক উপসংস্কৃতির বদলে যখন ইতালি চুড়ান্তভাবে সেখানকার ”জাতীয়” সংস্কৃতির ভাষিক মাধ্যমে পরিণত হয়, তখন এই ঐতিহাসিক ”আধুনিক” পশ্চিমা ভাষাটিতে বৈশি^ক মানদন্ডে খুব ছোট একটি সংখ্যালঘু গোষ্ঠী একাধারে বলতে, পড়তে এবং লিখতে শুরু করে। তারপরও বাস্তবতার নিরিখে, সমকালীন ইতালিয় লেখকেরা বলতে গেলে একপ্রকার বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতি। বিগত কয়েক দশকে তাদের জন্মের চাইতে মৃত্যুর হার অনেক বেশিই দেখতে পাওয়া গেছে। এই পরিমাণ থেকেই “জাতীয়” সাহিত্য বিলোপের মতো নতুন একটি ধারণার উৎপত্তি। একদিক দিয়ে, সাধারণ এই পরিমাপের এই ধারণার সঙ্গে একমত হওয়া খুবই সহজ যে “সমকালীন ইতালিয়ান সাহিত্য কেবল ইতালিয়ই নয় এটি একাধারে এটি আন্তর্জাতিকও, অন্তত যতক্ষণ পর্যন্ত এর ভৌগলিক সম্বন্ধ আমলে নেয়া হবে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত অব্যহতভাবে বর্তমান এই বহুমাত্রিক সংস্কৃতিক বিশে^র পাঠকদের সবার জন্য এর লাভালাভ সমানভাবে বজায় থাকবে।”