মুক্তিযুদ্ধ
যুদ্ধগাথা একাত্তর
এনায়েত কবীর
গুলির গন্তব্য থেকে
লুৎফুল হোসেন

প্রবন্ধ
চিত্রকর কমলকুমার মজুমদার
শেখ মিরাজুল ইসলাম

গল্প
মোজাফ্ফর হোসেন
সাদিয়া সুলতানা
আবু নাসের

নিবন্ধ
বিলেতে মিশুক মুনীরের সঙ্গে
শাকুর মজিদ

উপন্যাস
রূপে তোমায় ভোলাবো না
সৈয়দ আনওয়ারুল হাফিজ

গদ্য
বিজ্ঞাপনের ভাষা
নাজিব তারেক

বিশ্বসাহিত্য
মার্কেজ ও ক্যাস্ট্রো
লিওনার্ড কোহেন
আকিল জামান ইনু

বিশেষ রচনা
হোমারের জন্য প্রশস্তিগাথা
অনুবাদ: মাসরুর আরেফিন

সমকালীন ইতালিয়ান ফিকশন
সোহরাব সুমন

শ্রদ্ধাঞ্জলি
 সৈয়দ শামসুল হক

জীবনকথা
প্রজন্ম নক্ষত্র
রুখসানা কাজল

ভ্রমণ
হোটেল ডে আর্টস
মঈনুস সুলতান

টরন্টোর চিঠি
শামীম আহমেদ

অস্ট্রেলিয়ার চিঠি
ফজল হাসান

এবং
গুচ্ছ কবিতা
নাহার মনিকা

৯ বর্ষ ৯ সংখ্যা
এপ্রিল ২০১৭

লেখক-সংবাদ : প্রতি রাতে তাঁর সঙ্গী কবিতা, আর দিনমান দুনিয়ার তাবৎ কবির ঠিকুজি সন্ধানে রত ওমর শামস * মন সরানোর জো নেই হাবীবুল্লাহ সিরাজীর নয়া কিতাব ‘জো’ থেকে * একজন কমলালেবু নিয়ে বইমেলায় আসছেন শাহাদুজ্জামান; তাঁর অপর গ্রন্থ ‘ইলিয়াসের সুন্দরবন ও অন্যান্য’ * ফরিদ কবিরের ‘জীবনের গল্প’ লেখ্যরূপে বারবার বদলে চলেছে * রাশিয়ার ইতিহাস খুঁড়ে মশিউল আলম এঁকে চলেছেন ‘লাল আকাশ’, কমপক্ষে ৫০০ পৃষ্ঠার উপন্যাস হবে এটি * দারুণ সব অর্জন এলেও বছরভর শ্র“তিযন্ত্র যন্ত্রণা করেছে শাহীন আখতারের, এরই মাঝে ঘটে চলেছে ‘স্মৃতির ছায়াপাত’* নির্বাচিত গল্প সংকলনের কাজ গোছানো শেষ রাশিদা সুলতানার * ফারহানা মান্নানের ভিন্নধর্মী বই ‘একুশ শতক ও অন্য শিক্ষার সন্ধানে’ বইটি প্রকাশ করছে আদর্শ * হাসানআল আব্দুল্লাহর কবিতার জন্য হোমার ইয়োরোপিয়ান মেডেল প্রাপ্তি এবং চীন সফরÑ দুটোই দারুণ খবর * ফয়জুল ইসলাম নতুন গল্পের মুখ দেখছেন ‘আয়না’-য় * জোড়া কাব্য নিয়ে মেলায় ঢুকবেন ইমতিয়াজ মাহমুদ *





হোটেল ডে আর্টস
মঈনুস সুলতান
হোটেল ডে আর্টস এর অবস্থান প্যারিসের মোঁমাত এলাকার পাহাড়ের চাঁদিতে, পাঁচ নম্বর রু থোলোজ বলে পর্যটকদের পদভারে হামেশা ভরাক্রান্ত একটি সরনীতে। রেলওয়ে স্টেশনের কাছাকাছি ভাড়ায় শস্তা ভিনটেজ হোস্টেলে ছেড়ে আমি লোটা-কম্বল নিয়ে এখানে থানা গেড়েছি দিন তিনেক হয়। সহায় সম্বলওয়ালা বেশ ক’জন বনেদি পর্যটক এ হোটেলে মাসওয়ারি ঠিকায় বসবাস করছেন। এরা সকলেই কমবেশী বন্ধুবৎসল, বুটিক হোটেলটির লাউঞ্জে বসে বৈঠক করতে ভালোবাসেন। এদের এক জন গারনেল ওয়াকটার। এক সময় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর স্পেশাল ফোর্সের সদস্য হিসাবে কাজ করেছেন। প্রথম গাল্ফ ওয়ারে ইরাকে বসরার কাছাকাছি অপারেশন চালাতে গিলে বাম পা ও কোমরে গুলিবিদ্ধ হন। একটু খুঁড়িয়ে হাঁটলেও তার দেহমনে কমজোরীর কোন আলামত নেই। হলফিল গারনেল সাহেব সামরিক বাহিনী থেকে বাধ্যতামূলকভাবে অবসর গ্রহণ করে কেলিফোর্ণিয়াতে ‘বুট টু বিজনেস’ বলে কীসের যেন একটি তেজারতী কোম্পানী চালাচ্ছেন। তার রুজি রোজগার প্রচুর, বছরে মাত্র নয় মাস কাজ করেন। বাকি তিন মাস নানা দেশে ভ্রমণ করে দিন গোজরান করেন।
 ভিনটেজ হোস্টলে আমার বসবাসের মেয়াদ শেষ হয়ে এলে বাসস্থানের তালাশে আমি হোটেল ডে আর্টসে আসি। লাউঞ্জে মোলাকাত হয় গারনেল সাহেবের সাথে। তিনি খুব উৎসাহ দিয়ে বলেন,‘ চলে এসো এখানে, এ সরাইখানার জিওগ্রাফিক লকেশনকে ব্রিলিয়েন্ট বলা যায়। এখানকার বেলকনিতে বসে তামাম প্যারিস নগরীর ম্যাগনিফিসিয়েন্ট ভিউ এনজয় করতে পারবে। হোটেল হলেও এখানকার বসবাসের পরিবেশ খুবই কেজি এন্ড আই মাস্ট সে সামহোয়াট রোমান্টিক এ্যাজওয়েল।’ আমি একটি রুম বুক করে গাট্টি বোঁচকা নিয়ে এখানে চলে আসার উদ্যোগ নিলে গারনেল নিজে থেকে আমাকে লিফ্ট অফার করেন। তার গাড়িটি লজলড় হলেও বংশ পরিচয়ে তা ফেরারী সম্প্রদায়ের। এ ধরনের খানদানি যানবাহনে আমি ইহজিন্দেগীতে কখনো চাপিনি। ড্রাইভিং সিটের পাশে বসে ড্যাশবোর্ডে সোনালি হরফে সেন্ট্রেল আফ্রিকার মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন জুলমবাজ এক শাসকের নাম দেখে আঁতকে ওঠি। গারনেল সাহেব মৃদু হেসে বলেন,‘বাহনটি ফেরারী কোম্পানী স¤্রাট বোকাসার জন্য তৈরী করলেও তিনি তা এস্তেমালের সুযোগ পাননি। তার আগেই গদিচ্যুত হয়ে ফরাসী দেশে এসে আশ্রয় নেন।’
  দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে, আজ এ মুহূর্তে আর্টস হোটেলের লাউঞ্জে বনেদি বৈঠকবাজ কোন পর্যটকের সাক্ষাৎ পাই না। সকাল বেলা মোঁমাত অঞ্চলে পায়ে হেঁটে ঘন্টা দুয়েক ঘোরাফেরা করে আমি ক্লান্ত হয়ে ফিরে অনেকক্ষণ গরমজলে ¯œান করেছি। বেশ রিলাক্সড লাগছে, তাই সিল্কের ফতুয়া পরে খোশমেজাজে নেমে এসেছি লাউঞ্জে, এখানে আড্ডা জমানোর মতো কাউকে দেখতে না পেয়ে খানিক নিঃসঙ্গ লাগে। তো দেয়াল জোড়া আয়নায় আমি নিজের দিকে তাকাই। বেগুনি শেডের সানগ্লাসটি ফতুয়ার রেশমি কারুকাজের সাথে চমৎকার মানিয়েছে দেখে তৃপ্তবোধ করি। সাথে সাথে সচেতন হই আমার ভেতরে প্রচ্ছন্ন নার্সিসিজমের প্রবণতা সম্পর্কে। বিষয়টি চারিত্রিক সীমাবদ্ধতার পর্যায়ে পড়লেও একে ঠিক অপরাধ বলা চলে না। এ নিয়ে খামোকা দুশ্চিন্তা করার মতো মুড আমার নেই। আমি বরং তারিফের দৃষ্টিতে সানগ্লাসটিকে খুঁটিয়ে দেখি। রেবন ব্র্যান্ডের বেশ শৌখিন ফ্রেমের রোদচাশমাটির আবছা বেগুনি শেডে ফটোক্রমিকের ব্যাপার আছে। তাই ঘরে পরলে এর গাঢ় রঙ হাল্কা হয়ে ছড়ায় ল্যাভেন্ডার ফুলের স্নিগ্ধতা। বেশ দামি এ সানগ্লাসটি আমি নিজে খরিদ করিনি,আপাত অজানা কেউ তা উপহার হিসাবে রিসেপশন ডেস্কে রেখে গেছে। সাথে ছোট্ট একটি কার্ডও পেয়েছি, তাতে প্যারিসের রোদে ক্রমাগত ভুরু না কুঁচকে বেগুনি জোৎ¯œায় সিগ্ধ হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এখনো ঠিক রহস্য ভেদ করতে পারিনিÑকে ঠিক কি কারণে আমাকে এ সারপ্রাইজ গিফ্ট পাঠিয়েছে।
  গেল দু’তিন দিনে প্যারিসে আমার আরো কিছু প্রাপ্তি যোগ ঘটেছে। স্বদেশ থেকে পরিচিত এক প্রিয়জন পাঠিয়েছে রীতমতো গিলে করা কোর্তা-পায়জামা ও একাধিক সিল্কের ফতুয়া। প্যাকেটটি পশ্চিম আফ্রিকার সিয়েরা লেওনÑ যেখানে আমি পেশদারী কাজের সূত্রে হালফিল পার্মানেন্টলি বাস করছি, ওখানকার রাজধানী শহর ফ্রিটাউন থেকে পাউচ মারফত প্যারিসে সহি সালামতে এসে পৌঁচেছে দেখে আমি বেজায় তাজ্জব হয়েছি। সাথে সাথে উৎসাহের অতিশয্যে মেট্রোর ট্রেন চেপে ইন্ডিয়ান নেইভারহুডে গিয়ে কিনে এনেছি এক জোড়া বাহারে নাগ্রা ও কাশ্মিরী শাল। এ সব পরিধান করে গতকাল সন্ধ্যায় লাউঞ্জে বসা মাত্র পরিণত হয়েছিলাম আকর্ষণী দ্রষ্টব্যে। পর্যটক নারীরা আমাকে ভাস্কর্য দেখার আগ্রহে খুঁটিয়ে দেখেছে, একজন আইফোনে ছবি তুলে নিয়ে গেছে সেলিম শাহী নাগ্রার অগ্রভাগে জরিতে মোড়া প্রথম বন্ধনীর আকৃতির। সবচেয়ে বেশী তারিফ পেয়েছি যার কাছ থেকে তার নাম আডেলিনা। হোটেলের বারওয়ারি বাসিন্দা নয় এ নারী, তবে তাঁজা ফুলের সরবরাহ নিয়ে আসে প্রতিদিন সকাল বেলা। গতকাল সন্ধ্যাবেলা কি কারণে জানি সে লাউঞ্জে এসেছিলো। লোহার কাঠির আগায় আগুন নিয়ে মোমবাতিগুলো জ¦ালিয়ে দিতে দিতে মৃদুস্বরে বলেছিলো,‘ইউ লুকড গ্লোরিয়াস ইন দিস আউটফিট।’ আমি তাকে ‘মার্সি বকু’ বলে ধন্যবাদ জানাতে গিয়ে মোমের মৃদু শিখার আঁচে তার গন্ডদেশে গোধূলির আভা দেখে একটু অবাকও হয়েছিলাম।
  আমার প্রাপ্তিতে আরো যুক্ত হয়েছে সোনার পানি দৌড়ানো একটি কলম। আর্টস হোটেলে থিতু হয়েই আমি মেট্রো চেপে চলে যাই সেইন নদীর তীরে। সকাল বেলা পাড়ের প্রমেনাদে পর্যটকদের ভীড় ছিলো না একেবারে। আমি উইপিং উইলো বলে একটি বৃক্ষের ঝুরে নেমে আসা পত্রালির সবুজ ছায়ায় দাঁড়িয়ে ছিলাম একটুক্ষণ। দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে এক মহিলা তার দুটি বাচ্চাকে গল্পের বই পড়ে শোনা”েছন। আমি তাদের পাশ কাটিয়ে সামনে আসতেই দেখিÑ বেঞ্চে  বসে বৃদ্ধ এক পুরুষ কাঁপা হাতে আয়না ধরে রেজার চালিয়ে শেভ করছেন। আমি চলতে চলতে সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসি নদীর দিকে মুখ করা রেলিংয়ে বাঁধানো লুক-আউট পয়েন্টে। সল্প ঝুলের টাইটস্ পরা একটি লাল চুলো মেয়ে ইয়োগা করার ভঙ্গিতে শরীর বাঁকিয়ে তাকিয়ে আছে নদীজলে। এসব ইমেজরাজি স্মৃতিপটে ধারণ করতে করতে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসি নিচের লেয়ারে। ওখানে গাড়ি ঘোড়ার ট্রাফিক চলাচল বন্ধ করে দিয়ে বসেছে ফ্লি মার্কেট। বিক্রি হচ্ছে নিলামের দরে হরেক রকমের অলরেডি ইউজড্ পুরানো পণ্য। আমি ত্রিপল খাঁটিয়ে তৈরী তাঁবুগুলোর ভেতর দিয়ে পথ চলি। দেখিÑবিক্রি হচ্ছে রাজা চতুর্থ-দশ লুই এর আমলের কুরছি-কেদারা, শে^তপাথরের টেবিল, স্ফটিকের ঝাড়বাতি, আফ্রিকান মুখোশ ও  ইস্তামবুলের গোলাপপাশ। একটি দোকানে সাজানো রেমিংটন টাইপ রাইটার, গ্রামোফোন ও কালো রঙের রোটারি টেলিফোন দেখে আমি দাঁড়িয়ে পড়ি। তখনই চোখে পড়ে আবলুস কাঠের কেসে নীলাভ ভেলভেটে রাখা একটি সোনার অভারলে করা ফাউন্টেন পেন। বিরল কিসিমের এ ঝর্ণা কলমটি ওয়াটারমেন কোম্পানী বাজারজাত করে দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের দুই বছর আগে। খানিক দামদর করতেই তা কিনে ফেলা যায় মাত্র পয়ষট্টি ইউরোতে। বো টাই পরা ধূসর চুলের দোকানি ইংরেজী বলেন যৎসামান্য। তিনি জানানÑবছর দেড়েক ধরে ওয়াটারম্যান পেনটি বিক্রির চেষ্টা করছেন, কিন্তু কিছুতেই ক্রেতা জোটানো যাচ্ছিলো না। সাথে সাথে পাঁচ ইউরোতে মরোক্কো লেদারে বাঁধানো একখানা নোটবুকও কিনে ফেলি। তাতে চামড়ার উপর কারুকাজ করে আঁকা রাশিচক্রের চিত্র। দোকানি হেন্ডশেক করে ফাও হিসাবে বিনা মূল্যে দেন প্যালিকান কালি ভরা একটি কাচের দোয়াত।
  আমি একবিংশ শতাব্দীর লেখক হলেও কম্পিউটারে লেখালেখি করাটা পছন্দ করি না। তাই ঝরণা কলম সংগ্রহের সৌভাগ্যে আমার মাঝে ছড়ায় মৃদু এক্সাইটমেন্ট। ভাবিÑনির্জনতার সুযোগে একটু জার্নাল লিখতে বসবো। লাউঞ্জের লাগোয়া চমৎকার একটি হলরুম। তার সাইড টেবিলে রাখা আছে কিছু মোমবাতি ও কাচের নানা শেইপের মোমদান। পর্যটকরা চাইলে একটি হাতবাক্সে সামান্য কিছু পয়সা ফেলে মনে মনে কোন কিছুর আকাঙ্খা করে জ¦ালাতে পারেন মোমবাতি। তো অষ্টপ্রহর এখানে একাধিক মোমবাতি জ¦লছে বলে কামরাটিকে বলা হয় কান্ডোল লাইট কর্ণার। কফি পান, কম্পিউটারে ব্রাউজ করা, বা রকিং চেয়ারে অলস বসে থাকার জন্য এ স্পেসটি খুবই সুবিধাজনক। আমি ওখানকার একটি টেবিলে মরোক্কো লেদারের নোটবুক খুলে বসি। কামরাটির দেয়াল পলেস্তরাহীন পাথরে তৈরী। তাতে ঝুলছে খ্যাতনামা হয়ে ওঠেনি এ ধরনের শিল্পীদের সদ্য আঁকা কিছু চিত্র।
  আমি জার্নাল লিখতে বসে পণ্যের প্রতি আমার প্রলোভনের কথা ভাবি। ফিরোজা পাথরের আংটি বা মাসকটের আতর, অথবা প্যারিসের ফুটপাতে বিক্রি হওয়া স্ক্যাচ ইত্যাদি সংগ্রহের প্রতি আমার যে ঝোঁক তার অন্তর্গত মনস্তত্ত্ব নিয়ে আমি ভাবি। এ সব পণ্যের প্রাপ্তিতে আমার মাঝে ছড়ায় এক ধরনের খুশির অনুভুতি। বস্তুনিচয় সংগ্রহের প্রতি এটাচমেন্ট থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারি না বলে ব্যথিতবোধ করি।
  ছত্র কয়েক লেখা হয়ে যেতেই আমি পায়ের শব্দে চোখ তুলে তাকাই। দেখিÑম্যানুয়েল সান্তিয়াগো চামড়ার গ্ল্যাডস্টোন ব্যাগ নিয়ে এসে বসেছে উল্টাদিকের ডিভানে। আমেরিকার যুবক ম্যানুয়েল, মেক্সিকান হেরিটেজের জন্য তার গাত্রবর্ণ খানিকটা পাকা জলপাই এর মতো। তার গন্ডদেশে সাবধানে ছাটা বালুরঙের দাড়ির হাল্কা রেখা। স্টোন ওয়াশড জিন্সের প্যান্ট ও জ্যাকেট পরা এ তরুণের সাথে বার দুয়েক আমার অন্তরঙ্গ আলাপ হয়েছে। তার আচরণে এমন একটা কোয়ালিটি আছে যেÑনিজের ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ খুব সহজে খুলে বলা যায়। আপাতদৃষ্টিতে ম্যানুয়েলকে অগোছালো স্বপ্নপ্রবণ দেখালেও একটু খেয়াল করে তাকালে বোঝা যায় তার পেটা শরীরে তাগদ প্রচুর। প্রয়োজন পড়লে সে নির্মম হয়ে উঠতে পারবে নিমিষে। প্রথমবার আমি ম্যানুয়েলের সাথে যখন কথা বলি তখন সে আমার ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে খুঁটিয়ে প্রশ্ন করলে আমিও তার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনে নেই। যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সাবমেরিনের গানার হিসাবে কয়েক বছর কাজ করে ডিসিপ্লিনারী কারণে সে চাকুরি থেকে বরখাস্ত হয়েছে। তার ডিভোর্স হয়ে যাওয়া স্ত্রীর তরফে আছে একটি আট বছরের ছেলে। ম্যানুয়েল পয়সা খরচ করতে ভালোবাসে, এবং প্রাক্তন স্ত্রী ও ছেলের খোরপোষ বাবদ প্রতিমাসে তাকে টাকা পাঠাতে হয় বলে সে সব সময় তা উপার্জনের ধান্দায় থাকে। প্যারিসের কোন না কোন হোটেলে বসবাস করে বিত্তশালী মহিলা পর্যটকদের সে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে সঙ্গ দেয়। বিষয়টি বিস্তারিত শুনে আমি তার পেশাকে ‘এসকট সার্ভিস’ অভিহিত করলে সে তা শুঁধরে দিয়ে বলে এ ধরনের পেশার সঠিক টার্ম হ”েছ ‘জিগলো’। তার সাদাসাপটা বক্তব্য হচ্ছে,‘লিসেন ম্যান, নেভী থেকে কিকড্ আউট হয়েছি, আমার কোন পেনশন বা সেভিংস্ নেই, প্রচুর এক্সারসাইজ করে এ শরীর তৈরী করেছি, দিস ইজ মাই বিজনেস এ্যাসেট, আমি এটি ক্যাপিটাল হিসাবে খাটিয়ে উপার্জনের বন্দোব¯’ করে নিয়েছি।’ শুনেছি যেÑতার গ্ল্যাডস্টোন ব্যাগে রাখা আছে হরেক রকমের সেক্স-টয়। এগুলো আমি চাক্ষুস করিনি এখনো, তবে ব¯‘গুলো সম্পর্কে আমার কৌতূহল আছে।
  ম্যানুয়েলকে আমি ‘হ্যালো’ বললে সে ব্যাগ থেকে বের করে একটি শিশি আমাকে দেখিয়ে জানতে চায়, এ ধরনের কিছু আমি কখনো ব্যবহার করেছি কি না, এবং এ দ্রব্যের কার্যকারিতা কতটুকু। বোতলটি স্যান্ডেল উড পেস্টের। আমি মতামত দিলে সে উঠে এসে আমার ফতুয়ার সুচারু সিল্ক ছুঁয়ে এম্্েরাডারীর প্রশংসা করে বলে,‘ম্যান,ইউ লুক এক্সোটিক এন্ড ওরিয়েন্টাল, আমি নিশ্চিত যেÑ তোমার রেশমের ফুলে আজ বসতে চাইবে দু’চারটি প্রজাপতি।’  আমি চন্দনের ব্যাপারটি আরেকটু বিশদ জানতে চাইলে ম্যানুয়েল হেসে জবাব দেয়,‘এটা ছোটা কাজ, মাত্র মিনিট চল্লিশেক ম্যাস্যাজ করে দেবো, এ সব কাজে উপার্জন কম, বাট আ ভেরি গুড স্টার্ট, এর সূত্র ধরে জমে ওঠতে পারে বড় ধরনের ব্যবসা।’ কথা বলতে বলতে ম্যানুয়েল অন্যমনস্কভাবে হাসে। তখন খেয়াল করি, অন্তরঙ্গ হাসিতে তার মুখমন্ডল ও গলায় চাকু দিয়ে কাটাকুটির কয়েকটি দাগ গোবর দিয়ে নিকানো উঠানে মুরগির পায়ের ছাপের মতো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
  ব্যাগ হাতে লাউঞ্জের দিকে হেঁটে যেতে যেতে সে ফিরে তাকিয়ে বলে,‘ আমি তোমার প্যারিসে শস্তায় বসবাসের বিষয়টা ভেবে দেখেছি, এন্ড আই হ্যাভ আ কুল আইডিয়া, তুমি ইন্টারেস্টেড হলে আমি বিস্তারিত খুলে বলবো, উড ইউ লাইক টু গো আউট ফর কফি উইথ মি, ক্যাফেতে বসে কথাবার্তা বলা যাবে।’ আমরা রাজি হই আগামি কাল এগারোটার দিকে ক্যাফেতে বসার। সে কামরা থেকে বেরিয়ে যেতেই আমার ভাবনায় ঘুরে ফেরে তার আচরণ। সিয়েরা লেওনে পেশাধারী কাজকর্ম তামাদি হলে পর মোঁমাতে ফিরে এসে বছর খানেক এপার্টমেন্ট ভাড়া করে বসবাসের আকাক্সক্ষা আমার মাঝে প্রবল হ”েছ, বিষয়টি আমি তার কাছে খুলে বলতেই ম্যানুয়েল উদ্যোগ নিয়ে ¯’ানীয় ফরাসী পত্রিকার পাতা ঘেঁটে হোটেল আর্টস থেকে মাত্র দুই ব্লক দূরেÑ এক বছরের কনট্রাক্টে ভাড়া নেয়া যেতে পারেÑ এ ধরনের একটি এপার্টমেন্টের সন্ধান দেয়। সে ফ্রে  বলে চমৎকার, তাই গতকাল তাকে নিয়ে আমি এপার্টমেন্টটি চাক্ষুষ করতে যাই। দোতালার উপর মাত্র দুই কামরার আবাস¯’লে আছে আইভি লতায় ছাওয়া এক চিলতে বেলকনি। সিটিংরুমের হার্ডউডের ফ্লোর ও ফায়ারপ্লেস আমার খুবই পছন্দ হয়। কিš‘ ভাড়া শুনে যখন বুঝতে পারিÑআমার বাজেটে তা কিছুতেই কুলাতে পারবো না তখন ডিসএপোয়েন্টমেন্ট গোপন করা মুশকিল হয়ে পড়ে। ম্যানুয়েল বিষয়টি বুঝতে পেরে কাঁধে হাত রেখে অত্যন্ত অন্তরঙ্গভাবে বলে,‘ডোন্ট গেট আপসেট সো কুইকলি, আমি ভেবে দেখবো, মোঁমাত ইজ আ ফাইন প্লেস টু লিভ, তোমার যে বাজেট আছে সে অনুযায়ী বাসস্থানের একটা বন্দোবস্ত হয়ে যাবে। আর এপার্টমেন্ট ভাড়া করতে না পারলে আমার মতো না হয় মাসওয়ারী হোটেলে থাকবে, এন্ড ইউ উইল ফাইন্ড সামওয়ান টু পে ফর ইট।’ তার বক্তব্যের শেষ বাক্যটির রহস্য আমি ভেদ করতে পারি না, তবে মাত্র একদিনের পরিচয়ে মানুষটির উষ্ণ অন্তরঙ্গতা আমার খুবই ভালো লাগে।  
  হেঁটে হোটেলে ফেরার পথে ম্যানুয়েল খুব আগ্রহ নিয়ে আমি তারুণ্যের প্রথম বছরগুলোতে কী ধরনের তৎপরতায় যুক্ত ছিলাম তা শুনতে চায়। তো আমি সামান্য সময় সন্ত্রাসবাদী ধারার বাম রাজনীতিতে যুক্ত ছিলাম বললে সে আগ্রহ নিয়ে তা শুনে বলে,‘ডোন্ট হাইড দিস, দিস ইজ ইয়োর এ্যাসেট, তুমি চাইলে আমি দু-এক জনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবো, আলোচনায় এ প্রসঙ্গ চলে আসলে বিষয়টি এভোয়েড করবে না, বরং খুলে বলবে। দিস ইজ প্যারিস, এখানে..ইউ নো, এই মোঁমাত পাহাড়ে এক যুগে গড়ে ওঠেছিলো মেহনতী মানুষের প্যারি কমিউন।’ হোটেল ডে আর্টসের লোহিত বর্ণের সদর দুয়ার দিয়ে ঢুকে পড়ার সময় আমি তার ব্যাকগ্রাউন্ড বিস্তারিত জানতে চাই। কাঁধ শ্রাগ করে সে বলে,‘ মেক্সিকান অভিবাসির ছেলে আমি, বেডে ওঠেছি কেলিফোর্নিয়ার সূর্য¯œাত সানডিয়াগো শহরের স্লামে, কৈশর কেটেছে বস্তির হিস্পানিক গ্যাং সদস্যদের সহবতে। ছুরি মারামারি করে জেল খেটেছি ষোল বছর বয়সে, তারা আমাকে কারেকশ্যনাল ফেসিলিটিতে বন্দী করে রেখেছিলো পাক্কা দুই বছর। বেরিয়ে এসে স্কুল কলেজে লেখাপাড়ার কোন আগ্রহ বোধ করিনি। হরদম স্মোক করেছি ক্র্যাক কোকেন। পেশা হিসাবে এক সার্কাস শো তে ছুরির খেলা দেখাতাম। সো, বিলভ মি ম্যান, অল দিস ইন্টারেস্টিং ব্যাকগ্রাউন্ড মেড মি সুপার এটরাকটিভ নাও ইন প্যারিস।’
  আমি জার্নাল লেখাতে ফিরে গিয়ে নোটবুকে এবার মোঁমাতে বাস¯’ান যোগাড়ের বিষয়টিতে ফোকাস করি। আমি তো সপ্তা তিনেক পর ফিরে যা”িছ সিয়েরা লেওনের ফ্রিটাউনে। তবে খোঁজখবর নিয়ে রাখছি যাতে আরো বছর খানেক চাকুরি করে যখন অন্যত্র যাওয়ার প্রয়োজন পড়বে তখন এখানে এসে দ্রুত একটি পছন্দসই ঠিকানার বন্দোবস্ত করতে পারি। পাহাড়ের ঢালে এপার্টমেন্টটির আইভি লতার সবুজে ছাওয়া পিকচার উইন্ডোর কথা ভাবতেই মনে হয়Ñআই মাস্ট হ্যাভ আ প্লেস লাইক দিস। লেখা বন্ধ করে দিয়ে আমি আমার আকাক্সক্ষার তীব্রতার কথা ভাবি। একটি বিশ্লেষণ মনে রেখাপাত ঘটায়। ভাবি, শৈশবে আমি যে সব ঘরদুয়ারে বাস করেছি তা আমার মনঃপুত ছিলো না বলে কী আমার অবচেতনে জানালায় দুর্দন্ত ভিউ আছে, বেলকনিতে হাওয়া খেলে যায়Ñ এ রকম বাস¯’ানের চাহিদা অবদমিত হয়ে আছে?
  গতকাল সন্ধ্যায় ফ্রিটাউন থেকে পাওয়া একটি ছোট্ট ঘরের ছবির কথা আমার মনে ফিরে আসে। ছবিটি আমার মোবাইল ডিভাইসে পাঠিয়েছেন ফাংগাওয়া কাইকাই। তার দুই কামরার ঘরটি ঝুরঝুরে কাঠ ও জং ধরা টিনে তৈরী। এতে ফাংগাওয়ার বৃদ্ধ বাবা, ছেলে, ছেলের বউ ও দুটি নাতি নাতনি সহ মোট নয় জন মানুষের বসবাস। ফ্রিটাউনে প্রচুর বৃষ্টিপাত হলে পাহাড় থেকে নেমে আসা জলে তার ঘরটি প্লাবিত হয়ে ভরে ওঠেছে থিকথিকে কাদায়। বন্যা উপদ্রুত হয়ে ফাংগাওয়া কাইকাই সামান্য আর্থিক সাহায্যের আবেদন জানয়েছেন। আমি তার প্রত্যাশার সাথে আমার আকাক্সক্ষাকে তুলনা করি।
  তীব্র কালো গাত্রবর্ণের এ মানুষটি ফ্রিটাউনে এক সময় আমার কটেজে ছোটা কাজ করতেন। তার মুখের আকৃতিতে জগদ্দল একটা ব্যাপার আছে যা ভাস্করদের মূর্তি তৈরী করতে উদ্দীপ্ত করবে। পার্টির আয়োজন হলে তিনি এসে হাজির হতেন চিতাবাঘের চামড়ার মতো কালো ফোটাওয়ালা একটি বাটিকের ঢোলা শার্ট পরে। মিঠে হেসে মেহমানদের পরিবেশন করতেন ড্রিংকস। কখনো কাটা কাপড়ের পিস বিক্রি করা ফেরিওয়ালাকে ধরে তিনি নিয়ে আসতেন আমার কাছে। বাটিক বা টাইডাই করা কাপড়ের পিস কেনা হলে তিনি তা নিয়ে দর্জির দোকানে আসা-যাওয়া করতেন। দর্জি ও ফেরিওয়ালার কাছ থেকে পাওয়া যৎসামান্য কমিশনে তার তৃপ্তি ছিলো বিপুল। তাকে দিয়ে করানোর মতো যথেষ্ট কাজ আমার কটেজে তৈরী হতো না। তো ফাংগাওয়া কাইকাই খোঁজাখুঁজি করে কাজের সুযোগ তৈরী করে নিতেন। কখনো ঘরে ফিরে এসে দেখতাম তিনি স্বর্ণকারের দোকান থেকে এক ধরনের পালিশ সংগ্রহ করে পিতলের কয়েকটি মূর্তি ঘষামাজা করে ঝলমলে করে তুলেছেন রীতিমতো সোনার আভায়। এক সময় তার নজরে আসে ইউটিলিটি রুমে অযতেœ রাখা বাটিকে দৃশ্যপট আঁকা কিছু কাপড়ের দিকে। নিজ উদ্যোগে এগুলো তিনি কাঠ ও আয়নার ফ্রেমে নজরবন্দী করার বন্দোব¯’ করেন। উইকয়েন্ডে প্রায়ই পাকড়াও করে নিয়ে আসেন মাছের ফেরিওয়ালিকে। আমি মাছ কিনতে না চাইলে তিনি বেরকুডা মাছের লালচে রূপালি আঁশে হাত বুলিয়ে এমনভাবেÑ ‘দিস ইজ দ্যা ফাইনেস্ট এন্ড সুপার টেস্টি ফিস ইন আটলান্টিক,প্রোটিন রিচ এন্ড নো কোলাস্টারেল স্যার,’ বলে আমার দিকে তাকাতেনÑ যেন তিনি কোন চাকুরির উমেদারকে সৎ ও কর্মনিষ্ট বলে কারেকটার সার্টিফিকেট দি”েছন। অতঃপর আমার মৎস না কেনার কোন অজুহাত থাকতো না।
  আমার কটেজ থেকে তার চাকুরিচ্যুতি হয় ফ্রিটাউনে তীব্রভাবে ইবোলা ছড়ালে। তিনি টেক্সট ম্যাসেজ পাঠিয়ে জানান যে, তার পুরো পরিবারকে করিনটিন করা হয়েছে। তার বড় ছেলে এক সওদাগরি আফিসে ম্যাসেনজার হিসাবে কাজ করতো। সারাদিন চিঠিচাপাটি নিয়ে মোটর বাইক হাঁকিয়ে নানা জায়গায় ছোটাছুটির কাজ। তো চিঠি ডেলিভারি করে তার নিজস্ব অফিসে ফেরার দুদিন পর জানা যায়, যে ফার্মে চিঠি ডেলিভারি দিয়ে সে এক পেয়ালা চা খেয়েছিলো ওখানে ইবোলায় মৃত্যু হয়েছে পর পর দুজন মানুষের। যেহেতু সে ওদের সাথে কথাবার্তা বলতে বলতে চা খেয়েছিলো,সুতরাং তাকে হাইরিস্ক বিবেচনা করে কর্ম¯’ল থেকে বাড়ি পাঠানো হয় দ্রুত। সাথে সাথে পুলিশ এসে তাদের ঝুপড়ি জাতীয় ঘরের চার পাশে হলুদ রিবন দিয়ে মার্ক করে করিনটিনের লেভেল লাগিয়ে দেয়।
  করিনটিন হলে পরিবারের কারো দাগ দেয়া হলুদ রিবনের বাইরে যাওয়া নিসিদ্ধ। ঘটনার চার দিন পর ফাংগাওয়া কাইকাই আমাকে টেক্সট ম্যাসেজ করে খাবার সরবরাহের আবেদন জানান। প্রটেকটিভ গিয়ার তথা মুখে মুখোশ ও হাতে গ্লাভস পরে আমি চাল-তেল-ক্যানড্ ফিশ ও শিশু-খাবার নিয়ে তার বস্তির দিকে চলি। পাহাড়ের ঢালে বস্তিতে জংধরা ঢেউটিনের বেশুমার ঘরদুয়ার। এ গিঞ্জি পরিবেশে নর্মমার থিকথিকে কাদায় উড়ছে নীল রঙের সহ¯্র মাছি। টাঙ্গানো দড়িতে ঝুলিয়ে শুকানো হচ্ছে জামা-কাপড়। আমি আবর্জনার একাধিক স্তূপ অতিক্রম করে এসে পৌঁছি তার ঘরের আঙিনায়। তিনি নয় জন মানুষের তিন প্রজন্মের সংসার নিয়ে কীভাবে কোন ধরনের কুঁড়েঘরে বাস করেন তার সাথে প্রথম বারের মতো পরিচিত হই। ঢেউটিনের ছোট্ট ঘরের দাওয়ায় বসে পৃখুলা দেহের এক কৃষ্ণাঙ্গ নারী, বোধ করি তার পুত্রবধু। দেয়ালের কাছে দাঁড়ানো দুটি শিশু। তাদের মাথার উপরে লাল পেইন্ট দিয়ে দু’বার লেখা ‘কিপ পিস।’  ভাবি, ইবোলায় মৃত্যু না হলেও মরশুমি ঝড়ে যে কোন দিন এ ঝুরঝুরে ঘর ভেঙ্গে পড়ে নিহত হতে পারে কোন শিশু, বা আহত হতে পারে প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ। পাহারারত পুলিশ আমাকে জানান যেÑকরিনটিন হওয়া পরিবারের সাথে কথা বলা নিসিদ্ধ, তবে আমাকে ইয়োলো রিবনের মার্কিং এর ভেতরে খাবারের প্যাকেটগুলো রাখার পার্মিশন দেয়া হয়। তো পুলিশ শেডের পাশে দাঁড়িয়ে আমি ফাংগাওয়া কাইকাই এর সাথে মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করি। হয়তো বিদ্যুতের অভাবে তার ফোনে চার্জ দেয়া হয়নি। কানেক্ট করা যায় না। বিরক্ত হয়ে চীৎকার করি,‘মি. ফাংগাওয়া, আমি সুলতান, খাবার নিয়ে এসেছি, আপনাদের আর কিছু লাগবে কি?’ জানালা খুলে ওখানে খালি গায়ে এসে দাঁড়ান তার বাবা সিনিয়র কাইকাই। তিনি বলেন ,‘পাপা সুলতান, গড ইন হেভেন ব্লেস ইউ স্যার।’
  করিনটিনের মেয়াদ শেষ হয়ে আসে। তার পরিবারের কারো মৃত্যু হয় না। কিন্তু ফাংগাওয়া কাইকাই বা তার পুত্র ফিরে পান না করিনটিন পূর্ববর্তী কাজ। কারণ, একবার করিনটিনের ছাপ মারা হয়ে গেলে সমাজ তাদের বিবেচনা করে ইবোলা সংক্রমনের হাইরিস্ক ক্যারিয়ার হিসাবে। আমি ডাক্তারদের সাথে এ বিষয় নিয়ে শলাপরামর্শও করেছি। ফাংগাওয়া কাইকাইকে কাজে পুনরবাসিত করার ক্ষেত্রে চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে নেই কোন বাধা নিষেধ। তবে সমস্যা আমার সমাজ নিয়ে। আমি ফ্রিটাউনের যে রেসিডেনসিয়েল কম্পাউন্ডে বাস করছি, সেখানকার দেয়াল ঘেরা পরিবেশে প্রতিবেশী হিসাব বাস করছে আরো কয়েকটি কুটনৈতিক পরিবার। ফাংগাওয়াকে কাজে ডেকে আনার ব্যাপারে আমি তাদের সাথে কথা বলেছি, অজানা রিস্কের কথা ভেবে সকলে ঘোরতর আপত্তি তুলেছেন। তাদের মতামতকে উপেক্ষা করার মতো সাহস আমি দেখাতে যাইনি পেশাগত সংহতির কারণে। কিন্ত আমার আচরণকে আমি নৈতিকভাবে সমর্থন করতে পারিনি।
  জার্নালে মোঁমাতে পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়ানো নিয়ে লিখতে বসেছিলাম, কিন্তু কিছুতেই ফাংগাওয়ার জলকাদায় থিকথিকে ঝুপড়ি-ঘরের ইমেজ থেকে মন ফেরানো যাচ্ছে না দেখে নিজের ওপর বিরক্ত হই। চেষ্টা করি আমার প্রসঙ্গান্তরে যাওয়ার প্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে। তখনই মনে হয়Ñ আমি যেভাবে মোঁমাতে একটি শৌখিন এপার্টমেন্ট ভাড়া নেয়ার বাসনাকে লালান করছি, ফাংগাওয়া কী ঠিক এভাবে স্বপ্ন দেখেন চমৎকার কোন আবাসিক এলাকায় নীল রঙের টালির ছাদ দেয়া ছয়-সাতটি কামরাওয়ালা দোতালা বাড়ির। বছর খানেক পর আমি যদি আসলেই মোঁমাতে স্থায়ীভাবে বসবাসের বিষয় আর্থিক ভাবে ম্যানেজ করতে পারি, আর তখন যদি ফ্ল্যাশ ফ্ল্যাডে তার নাতি-নাতনিদের একটি তিফিল শিশু ভেসে যায়, কিংবা কারো মৃত্যু হয় ঝুরঝুরে ঘরটি ধ্বসে পড়ে, তাহলে এ মৃত্যুজনিত অপরাধের দায় কী আমার ওপরও আংশিকভাবে বর্তাবে?