মুক্তিযুদ্ধ
যুদ্ধগাথা একাত্তর
এনায়েত কবীর
গুলির গন্তব্য থেকে
লুৎফুল হোসেন

প্রবন্ধ
চিত্রকর কমলকুমার মজুমদার
শেখ মিরাজুল ইসলাম

গল্প
মোজাফ্ফর হোসেন
সাদিয়া সুলতানা
আবু নাসের

নিবন্ধ
বিলেতে মিশুক মুনীরের সঙ্গে
শাকুর মজিদ

উপন্যাস
রূপে তোমায় ভোলাবো না
সৈয়দ আনওয়ারুল হাফিজ

গদ্য
বিজ্ঞাপনের ভাষা
নাজিব তারেক

বিশ্বসাহিত্য
মার্কেজ ও ক্যাস্ট্রো
লিওনার্ড কোহেন
আকিল জামান ইনু

বিশেষ রচনা
হোমারের জন্য প্রশস্তিগাথা
অনুবাদ: মাসরুর আরেফিন

সমকালীন ইতালিয়ান ফিকশন
সোহরাব সুমন

শ্রদ্ধাঞ্জলি
 সৈয়দ শামসুল হক

জীবনকথা
প্রজন্ম নক্ষত্র
রুখসানা কাজল

ভ্রমণ
হোটেল ডে আর্টস
মঈনুস সুলতান

টরন্টোর চিঠি
শামীম আহমেদ

অস্ট্রেলিয়ার চিঠি
ফজল হাসান

এবং
গুচ্ছ কবিতা
নাহার মনিকা

৯ বর্ষ ৯ সংখ্যা
এপ্রিল ২০১৭

লেখক-সংবাদ : প্রতি রাতে তাঁর সঙ্গী কবিতা, আর দিনমান দুনিয়ার তাবৎ কবির ঠিকুজি সন্ধানে রত ওমর শামস * মন সরানোর জো নেই হাবীবুল্লাহ সিরাজীর নয়া কিতাব ‘জো’ থেকে * একজন কমলালেবু নিয়ে বইমেলায় আসছেন শাহাদুজ্জামান; তাঁর অপর গ্রন্থ ‘ইলিয়াসের সুন্দরবন ও অন্যান্য’ * ফরিদ কবিরের ‘জীবনের গল্প’ লেখ্যরূপে বারবার বদলে চলেছে * রাশিয়ার ইতিহাস খুঁড়ে মশিউল আলম এঁকে চলেছেন ‘লাল আকাশ’, কমপক্ষে ৫০০ পৃষ্ঠার উপন্যাস হবে এটি * দারুণ সব অর্জন এলেও বছরভর শ্র“তিযন্ত্র যন্ত্রণা করেছে শাহীন আখতারের, এরই মাঝে ঘটে চলেছে ‘স্মৃতির ছায়াপাত’* নির্বাচিত গল্প সংকলনের কাজ গোছানো শেষ রাশিদা সুলতানার * ফারহানা মান্নানের ভিন্নধর্মী বই ‘একুশ শতক ও অন্য শিক্ষার সন্ধানে’ বইটি প্রকাশ করছে আদর্শ * হাসানআল আব্দুল্লাহর কবিতার জন্য হোমার ইয়োরোপিয়ান মেডেল প্রাপ্তি এবং চীন সফরÑ দুটোই দারুণ খবর * ফয়জুল ইসলাম নতুন গল্পের মুখ দেখছেন ‘আয়না’-য় * জোড়া কাব্য নিয়ে মেলায় ঢুকবেন ইমতিয়াজ মাহমুদ *





চিত্রিত মোম ও রঙের কনসার্ট
মঈনুস সুলতান
এন্ডি সিল্কের ফতুয়া পরে ল্যাভেন্ডারের অডিকোলন মাখতেই শরীরে ছড়ায় ফ্রেস অনুভূতি। আজ আমি কোথাও যেতে চাচ্ছি না। কিছুদিন হলো আমি আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলের ছোট্ট রাজ্য সোয়াজিল্যান্ডের রাজধানী মবুবানে বাস করছি। এখানে আমার আস্থান হচ্ছে বোমবাসো ব্যাকপ্যাকার্স লজ। এ লজের বর্ণাঢ্য দেয়ালচিত্র খুব সস্তা বাজেটে ট্র্যাভেল করনেওয়ালা পর্যটকদের তীব্রভাবে আকর্ষণ করে। দারুণ নীল রঙের প্রেক্ষাপটে লোহিত গিরগিটির দেয়ালচিত্রের জন্য অনেকে আমোদ করে এ পর্যটন সরাইকে বলে থাকেন ‘রেড লির্জাড ডেন’। আমরা জনা কয়েক পর্যটক এখানে সপ্তাহওয়ারি ভাড়ায় বাস করছি। আমরা একই কামরা শেয়ার করে বাংক-বেডে জোড়ায় জোড়ায় বাস করিÑযা ডাবোল ডেকার বলে পরিচিত। পরষ্পরের সাথে অনানুষ্ঠানিকভাবে মিথষ্কিয়ার জন্য এ গেস্ট-লজে আছে অত্যন্ত কোজি একটি লাউঞ্জ। আজ আমি লজ এর লাউঞ্জে শুয়ে বসে সময় কাটিয়ে দিতে চাচ্ছি, এখান থেকে উঠে শহরে বেরুতে ইচ্ছা হচ্ছে না একেবারে। চিনুয়া আচেবের লেখা ‘থিংকস্ ফল এপার্ট’ বইখানা হাতে নিয়ে আমি লাউঞ্জে পাতা বেতের ইজিচেয়ারে এসে বসি। এন্টি ডিপ্রেসেন্ট ট্যাবলেট খেলে শরীরে যে রকম নেমে আসে এক ধরনের কুয়াশাচ্ছন্ন ঘোর, তেমনি অবসাদ ছড়িয়ে পড়ছে দেহমনের আনাচে কানাচে। গেল কয়েকদিন ধরে রাত্রিবেলা ঘুষঘুষে জ্বর হচ্ছে। দিনের বেলা তাপ নেমে গেলেও উদ্যোমে ব্যাপক খামতি আসে। দুপুর গড়িয়ে বিকাল হতে চললো। ব্যাকপ্যাকার্স লজের সকলেই কমবেশী ঘুরে বেড়াচ্ছে মবুবান শহরের নানা জায়গায়। কেবল মাত্র ইংরেজ তরুণী ক্যোরাল সিত্রোন কোথাও বের হয়নি। কয়েকদিন ধরে ক্রমাগত ডিম পাড়ার ডিউরেশন শেষে জুমরা লেগে বসে থাকা মুরগির মতো সে অলসভাবে শুয়ে আছে ডিবানে। ব্যাকপ্যাকার্স লজের সকলে বাইরে গেছে বলে বাথরুম কারো সাথে শেয়ার করতে হয়নি। অনেকক্ষণ ধরে গোছল করেছি গরমজলে। এবার চেষ্টা করি চিনুয়া আচেবের ‘থিংস ফল এপার্ট’ বইখানা পড়তে। বোধকরি তৃতীয়বারের মতো পুস্তকটি আবার পড়ছি। কনসেনট্রেশন আসে না। অনেক বছর পর অপ্রাপ্তির বিষয়টি মনে আসে। ইউনিভারসিটি অব ম্যাসাচুসেটসে আমি যে বার ছাত্র হই, তার বছর দেড়েক আগে চিনুয়া আচেবে অধ্যাপনার কাজ শেষ করে ফিরে গেছেন তার নেটিভল্যান্ড নাইজেরিয়োতে। পরে একবার সপ্তাহ দুয়েকের মতো কি কাজে যেন ফিরে আসেন ইউনিভারসিটিতে, সেমিনার দেন। থিংকস্ ফল এপার্ট পড়ে আমরা তাঁর লেকচার শুনতে বসি। খুব অল্প সময়ের জন্য তাঁকে খানিক দূর থেকে দেখা। তাঁর ক্লাসে ছাত্র হিসাবে বসতে না পারার খেদ এখনো সফেদ কোর্তায় কালো দাগের মতো কলিজায় লেগে আছে দেখে তাজ্জুব হই। সহসা এ স্মৃতিময় অনুভবের জন্য থিংস ফল এপার্ট পড়ার উৎসাহে ভাটা পড়ে। বাট হোয়াট টু ডু? কিছু একটা করে তো বিকাল পার করতে হয়। তাই ইজিচেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ি।

লাউঞ্জের এককোণে দাঁড় করানো শেল্ফে রাখা বেশ কিছু বইপত্র। ব্যাকপ্যাকার পর্যটকরা বেশী মালমাত্তা ক্যারি করতে চান না। ওজন কমানোর অসিলায় তারা পড়া হলে গেলে সচরাচর বইপত্র লজের এ শেল্ফে রেখে যান, যাতে অন্য পর্যটকরা তা পড়ে সময় কাটাতে পারেন। আমি শেল্ফে খোঁজাখুঁজি করেও কবিতার কোন বই পাই না। শেল্ফের পাশেই ডিভানে শুয়ে ক্যোরাল সিত্রোন। সে সাটিনের সফ্ট পিজামা-প্যান্ট পরে বুকের নিচে কুশন রেখে একটি বই এর পাতায় চোখ বোলাচ্ছে। পেইনটিংস্ এ বইটি আমারও প্রিয়। চিত্রিত এ পুস্তকটি ক্যোরালের নিজস্ব। সে প্রায়ই ঘাঁটে, এবং পড়া শেষে লাউঞ্জের টিপয়তে রেখে যায় বলে আমিও বার কয়েক তার পৃষ্টা উল্টে দেখেছি। ভাসিলি কানডিনস্কি (১৮৬৬-১৯৪৪) নামে র‌্যাশান এক চিত্রশিল্পীর কম্পোজিশনের কয়েকটি ছবির বর্ণ এমনই সিগ্ধ ও মেদুর যে, তাকালে মনে হয় আংগুল দিয়ে স্পর্শ করছি নীল পাটকিলে হলুদাভ আবিরের গুড়া। ক্যোরাল এ মুহূর্তে নীরবে যে চিত্রটি চিবুকের নিচে রেখে অবলোকন করছে, তার শিরোনাম কম্পোজিশন-৮। ছবিটিতে যেন জ্যামিতিক কায়দায় সঙ্গীতের যন্ত্রকে ব্যবচ্ছেদ করা হয়েছে। মনে হয় তাতে এখন ক্যোরালের নিঃশ্বাস প্রশ্বাস লেগে বাজছে রঙের বিমূর্ত সারেঙ্গীটি মৃদু মৃদু।

আমি জুতমতো বই খুঁজতে খুঁজতে তার দিকে তাকাই। কিন্তু ক্যোরাল কোন কথা বলে না। সল্পভাষী সে, কথাবার্তায় সচরাচর জড়াতে চায় না। তবে একটু আগে আমি গোছল সেরে বাথরুমের করিডোরে দাঁড়িয়ে চুল ব্রাশ করছিলাম, তখন সে লেডিজ রুমে যেতে যেতে একটু থেমে মৃদু হেসে আমার এন্ডি সিল্কের ফতুয়ার তারিফ করেছিলো। একটু অতিশয্য করে বলেছিলো যে,এ ধরনের পট্টবস্ত্রে দেখাচ্ছে যেন কোন বাতিঘরের ঝুল বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমি দেখছি সমুদ্রের ঊর্মিমালা। ডিভানের পাশে টিপয়তে রাখা একটি কবিতার প্রিন্টআউট দেখতে পেয়ে তা তুলে নিয়ে আবার তার দিকে তাকাই। সাটিনের মেরুন পিজামা-প্যান্টে ফুটে উঠেছে তার নিতম্বের বক্র ভাঁজ। ক্যোরাল কথা বলে না। কিন্তু অলসভাবে বাঁ’পায়ের নিচে একটি কুশন এডজাস্ট করে নিলে তাকে সেক্স-কিটেনের মতো আকর্ষণীয় দেখায়। তো আমি ফিরে আসি ইজিচেয়ারে।

প্রিন্টআউটে একগুচ্ছ কবিতার রচয়িতার নামÑএন্ডি বিকো ডিলান মাটেবেসে। এ হিপি কবির নিবাস দক্ষিণ আফ্রিকায়। তার কোন গ্রন্থ বেরিয়েছে কি না, আমার জানা নেই। তবে হিপি গোছের পর্যটকদের হরেক রকমের ওয়েভ সাইটে এগুলোর তালাশ পাওয়া যায়। তার একটি পদ্যের দুটি চরণ এ অঞ্চলের পানশালায় ফ্লার্ট করনেওয়ালা পর্যটকদের মুখে মুখরোচক লবজ্ হয়ে ফেরে ,“আই লাভ ইউ বিকজ ইউ আর মামা-মাজিং/উয়োম্যান ইউ আর সুপার অ্যামেজিং।” আমি এ মুহূর্তে ডিলান মাটেবেসের গুচ্ছ কবিতার প্রিন্টআউটে ব্রাউজ করতে গিয়ে স্বর্ণকারের ছাইগাদায় পেয়ে যাওয়া সোনালি কণার মতো কুড়িয়ে নেই ঝকমকে একটি পংক্তি,“ অনলি এক্সপেকটেশন ইজ নট এক্সপেকটিং..।” অর্থাৎ “একমাত্র প্রত্যাশা হচ্ছে আদতে কোন কিছুর প্রত্যাশা না করা।”

না, ডিলান মাটেবেসে’র পদ্য আমাকে ধরে রাখতে পারে না বেশীক্ষণ। মন আবার ফিরে যায় ভাসিলি কানডিনস্কি’র চিত্রকলায়। বলা হয়ে থাকে যেÑতার আর্টের প্রধান দিক হচ্ছে আঙ্গিক ও বর্ণ। নকশা ও নানা রকমের শেইপের দিকে তিনি নজর দিয়েছেন প্রচুর। সচেতনভাবে চাননি অর্থবোধক হয়ে ওঠুক তার চিত্র। তবে কম্পোজিশনে গীতলতার একটা ব্যাপার আছে, সঙ্গীতের মতো সুরেলয়ে বাজিয়ে তিনি যেন তৈরী করেন রঙের কনসার্ট। এ নিয়ে ক্যোরালের হাতে ধরা চিত্র-পুস্তকের পয়লা পৃষ্টায় একটি উদৃতি আছে। তাতে আর্ট সম্পর্কে তিনি তার রূপকল্পকে ব্যক্ত করেছেন। রঙকে তার সবসময় মনে হয়েছে কীবোর্ডের মতো। চোখকে তিনি ব্যবহার করেন রীড হিসাবে। আর তার আত্মা হচ্ছে মূলত একটি পিয়ানো যা সৃষ্টি করে বর্ণের বিচিত্র সিম্ফনি।

একটি বিষয়ে খটকা লাগে। আমার মস্তিষ্ক কেন এ মুহূর্তে ভাসিলি কানডিনস্কি’র চিত্রকলা সংক্রান্ত তথ্য প্রসেস করছে। তবে কি আমার অবচেতন চিনুয়া আচবের পুস্তক কিংবা অখ্যাত হিপি কবিতা না পড়ে বরং চাচ্ছে ভাসিলির কম্পোজিশনের দিকে তাকিয়ে থাকতে? নাকি আমার মন সিলেক্ট করছে ক্যোরালের সাথে বাতচিতের একটি বিষয়বস্তু? ডিভানের কাছাকাছি কাচের জানালায় খুটখাট শব্দ হলে একটু হামাগুড়ি দিয়ে শরীর বাড়িয়ে ক্যোরোল শার্সি খুলে দেয়। ক্বক ক্বক করে একটি বনমোরগ ঝাপিয়ে পড়ে তার কোলে। সে পালকে হাত বুলাতে বুলাতে কুশনের নিচ থেকে বের করে ট্রেইল মিক্সের ছোট্ট প্যাকেট। তা ছিড়ে সে মোরগটিকে খাওয়াতে শুরু করে কিসমিস ও চিনাবাদাম। অবস্থা দেখে আন্দাজ করিÑ সে মোরগটির প্রত্যাশা করছিলো। বোমবাসো ব্যাকপ্যাকার্সে বাস করতে করতে আশপাশে ঝোপঝাড় প্রান্তরের প্রকৃতির সাথে তার গড়ে উঠছে নিবিড় সম্পর্ক। ক্যোরালের চরিত্রের এ দিকটি আমি আগে খেয়াল করিনি।

আদার খাওয়ানো শেষ হলে বনমোরগটিকে জানালা গলিয়ে বাইরে উড়িয়ে দিয়ে ক্যোরাল আবার ডিভানের কুশনে কাত হতেই ছত্রগুলো আমার চোখে পড়ে। ডিলান মাটেবেসে’র একটি পদ্যের  হাসিয়ায় গোটা গোটা হস্তাক্ষরে লেখা,“হোয়াট এভার আই সি আই সোয়ালো ইমিডিয়েটলি/জাস্ট এ্যজ ইট ইজ আনমিস্টেড, ওনলি ট্রুথফুল।” কবিতাটি সিলভিয়া প্লাথে’র। ‘মিরর’ শিরোনামের প্রগাঢ় উপলব্দিতে উচ্চকিত এ কবিতা শুরু হয়েছে,“আই অ্যাম সিলভার, এক্সেট, আমি লিভ নো প্রিকনসেপশন।” হাতের লেখা আমার পরিচিত, তবে বুঝতে পারি না, ক্যোরাল এ ছত্রগুলো লিখলো কেন?

সওয়ালটি মাথায় আসতেই সে ডিভান থেকে ওঠে পড়ে হাই তুলে, আড়মোড়া ভাঙ্গে। তার নাভীর নিচে ড্রস্ট্রিংয়ের প্রান্তে দুলে পশমের সাদা গুটি। ফ্রিল দেয়া স্লিভলেস টপের অজস্র কুঁচি পাঁজরের কাছে জড়ো হয়ে আছে বলে তার ভরাট বুক দুটিকে দেখায় জলে আধভাসা পাথরের মতো। বহমান স্রোতজলের ঘর্ষনে যেন তাতে জমেছে শুভ্র ফেণা। ক্যোরাল অগোছালো চুলের গোছাকে দুহাতের মুঠিতে প্যাচিয়ে তাতে জড়ায় ক্রান্সির বন্ধন। তারপর হেঁটে এসে লিকার কেবিনেট থেকে বের করে ভোদকার বোতল। জানালার আলোর দিকে তুলে তার তলায় জমে থাকা মেঘাচ্ছন্ন তরলের দিকে দিশা ধরে তাকিয়ে থেকে শটগ্লাসে ঢেলে এক কুল্লিতে তা গিলে ফেলে। চোখমুখের রেখা স্বাভাবিক হয়ে আসতেই সে একই শটগ্লাসে আরো কিছু তরল ঢেলে আমার দিকে ইশারা করলে আমি মাথা ঝাঁকিয়ে নিট পান করতে অস্বীকার করি। সে আবার ফ্রিজ খুলে বের করে আনে অরেঞ্জ জুসের কার্টেন। দীর্ঘ একটি গ্লাসে ভোদকার সাথে তা মিশিয়ে, আইস কিউব দিয়ে, গ্লাসের কানায় লেবুর একটি চাকতি গেঁথে দিয়ে তা আমার ইজিচেয়ারের পাশে টিপয় এর ওপর রাখে।

অবসাদে উজ্জীবন যোগাবে ভেবে আমি পানীয়তে সিপ্ নেই। বেশ কিছুদিন হলো বোমবাসো ব্যাকপ্যাকার্স লজে বাস করছি আমরা দুজনে। তার সাথে খুব সীমিত মাপের কথাবার্তা হলেও আমাদের মাঝে গড়ে উঠেছে খানিক অন্তরঙ্গতা। আমি প্রায় প্রতিদিন পদব্রজে ঘুরতে বেরোই মবুবান শহরের অলিগলিতে। প্রচুর ঘুমের ঔষধ ও এন্টি ডিপ্রেসেন্ট পিল নেয়ার কারণে আমার ত্বক হয়ে পড়েছে সূর্যালোকে অত্যন্ত সেনসেটিভ। মাঝে মাঝে আমি শহর চষে মাইগ্রেন নিয়ে ফিরে আসি ব্যাকপ্যাকার লজে। বিষয়টি তার নজরে এসেছে। দিন চারেক আগে আমি রোদে বেরোনোর মুখে ক্যোরাল কোন কথা না বলে আমার হাতে ধরিয়ে দেয় বুয়ার স্টাইলের প্রশস্থ ব্রিমওয়ালা একটি হ্যাট। তা পরলে আমাকে কোয়েকার ঔটসের টিনে আঁকা সাহেবের ছবির মতো বদখত দেখায়। তবে বস্তুটি রোদ ফেরাচ্ছে তুমুলভাবে। বুঝতে পারি সে ভালোবাসে বর্ণ, তাই আমি প্রতিদান হিসাবে ক্রয় করেছি একটি রঙদার বস্তু। জিনিসটি এখনো তার হাতে তুলে দেয়ার মওকা পাইনি।

ক্যোরাল আবার ফিরে গেছে ডিভানে। সে আধশোয়া হয়ে খুব মৃদু ভলিওমে বাজাচ্ছে তার মিনিয়েচার বুম-বক্স। সে যন্ত্রসঙ্গীত এর সিডি চড়িয়েছে। একটি সুরের প্রবাহমান তাললয় অগভীর ছড়া নদীতে মাছের মতো ভেসে এসে আমাকে ছুঁয়ে যায়। সুরটি পরিচিত। ঘাড় বাঁকিয়ে আমি তার দিকে তাকাই। না,বুম-বক্স সে বাজাচ্ছেনা, তার পাশে ডিভানে পড়ে আছে তা, তবে সে বাজাচ্ছে আইপড। অনেক বছর পর স্মৃতির ছড়া নদী বেয়ে গানের কথা পিঠ ভাসানো রূপালি মাছের মতো স্পষ্ট হয়,‘ঘুমের ছায়া চাঁদের চোখে, এ মধুরাত নাহি বাকি..।’ তার নানা দেশের গান সংগ্রহের বাতিক আছে। বোমবাসো লজের বৈকালিক চা এর মহফিলে আমরাÑ হরেক দেশের পর্যটকরা পালা করে নানা মূলুকের গান বাজাই। আমি একদিন লজের বারওয়ারি স্টিরিওতে তালাত মাহমুদের একটি টেপ চড়িয়ে ছিলাম। ‘সুর হুয়ে হ্যাঁয় চাঁদ ঔর তারে’ বলে একটি গান তাকে ছুঁয়েছিল। সে নীরবে তা কপি করে নিয়ে গেছে তার চমৎকার রেকর্ডার দিয়ে। ‘ঘুমের ছায়া চাঁদের চোখে..’, গীতটিও কমল দাসগুপ্তের সুরে তালাতজীর গাওয়া। আমি তাকে এর কোন টেপ সরবরাহ করিনি। এ গান ক্যোরাল কালেক্ট করলো কোথা থেকে? ইন্টান্যাটে এসব সঙ্গীত সুলভ হয়েছে কি?

ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিতে পাশ দেয়া মেয়ে ক্যোরালের আত্মবিশ্বাস নিয়ে তুমুল সমস্যা আছে। এ তথ্যটি ব্যাকপ্যাকার লজের বাসিন্দাদের কাছে ওপেন সিক্রেটের মতো। আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির জন্য সে সপ্তাহ দুয়েক পাহাড়ে রক ক্লাইমবিং, প্রপাতের তলায় খরস্রোতা সফেন জলে হোয়াইট ওয়াটার রাফটিং ইত্যাদির চেষ্টা করেছে। সফলতা আসেনি, তাই গায়ে গতরে ব্যথা নিয়ে বর্তমানে সে বালুচরে পড়ে থাকা কিউট ডলফিনের মতো ডিভানে গড়াচ্ছে। ক্যোরাল সম্পর্কে যতোটা জেনেছি, তাতে মনে হয় তার দিনযাপনের প্রতিটি তৎপরতা উদ্দেশ্য প্রনোদিত। প্রতিটি কাজই সে করছে চিন্তা ভাবনা করে মনস্তত্ত্বের বইপত্র ঘেঁটে। ঠিক বুঝতে পারি না, তার সঙ্গীত সংগ্রহ বা কম্পোজিশনের বর্ণে বিভোর হওয়ার সাথে আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির কোন সম্পর্ক আছে কি না? আর আরেকটি বিষয়, আবার সে আইপডে ছোট্টমুট্ট সাউন্ড বক্স জুড়ে দিয়ে বাজাচ্ছে ‘ঘুমের ছায়া চাঁদের চোখে..।’ এ বাজানো কি উদ্দেশ্য প্রণোদিত? এ গীতের ভাষা যে বুঝতে পারে, তার সাথে কমিউনিকেশনের কোন মতলব তার আছে কি না ..?

পানীয়ের ঝাঁঝে ঝিমিয়ে পড়েছিলাম। তন্দ্রা ভাঙ্গতেই দেখি জানালার শার্সি গলে ধেয়ে আসছে সূর্যাস্তের তীর্যক আভা। লজ আজ এতো নির্জন হয়ে আছে যে, ইজিচেয়ারে শুয়ে শুয়ে আমি প্রপাতের ধারাজলের পরিষ্কার শব্দ শুনি। খুব আলসে লাগলেও আহারের বন্দোবস্থ করতে হয়। দুপুরের খাবার স্রেফ স্কিপ করেছি। তাই কিচেনে এসে একসাথে লেট-লাঞ্চ ও আর্লি ডিনারের আয়োজন করি। মালোয়েশিয়ান পরোটার প্যাকেট ছিড়ে ফ্রাইপ্যানে ছাড়তেই তা চিড়বিড় করে ওঠে। ক্যান খুলে কারি পাউডার ছিটিয়ে চানা-মাশালা তৈরী করতে সময় বেশী লাগে না। চা এর কেটলি বসাতেই ক্যোরাল কিচেনের দোরগোড়ায় এসে নাক কুঁচকে বলে,‘ফুড স্ম্যাল সো গুড।’ আমি কেটলিতে ডার্জিলিং টি এর প্যাকেটের সাথে এলাচির দানা মেশাতে মেশাতে বলি,‘ক্যোরাল, ইউ আর গোনা ইট উইথ মি।’ সে আপত্তি জানিয়ে বলে,‘আই অ্যাম নট রিয়েলি হ্যাংরি।’ তবে টেবিলে বসে সে। অতঃপর পরোটা ফিরিয়ে দিয়ে চামচ দিয়ে খায় সামান্য একটু চানা-মাশালা। স্পাইসি বলে চেয়ে নেয় অল্প খানিকটা দই। চা এর পানি এমন গরম হয়েছে যেÑআমি তা পিরিচে ঢেলে পান করি। তাতে ক্যোরাল বিষ্মিত হয়ে সেও পিরিচে চা ঢালে। তো আমি বলি,‘ক্যোরাল, লুক এ্যাট দা টি কেয়ারফুলি।’ সে ফুঁ দিতে দিতে বলে,‘মনে হয় হাতের তালুতে ধরে আছি ছোট্ট এক হ্রদ।’ আমি রেসপন্সে বলি,‘ভালো করে তাকাও ক্যোরাল, চাইলে চা এ তোমার হৃদয়ের প্রতিফলন দেখতে পাবে।’ সে সিরিয়াসলি জবাব দেয়,‘ইয়েস আই অ্যাম সিয়িং ইট, সিয়িং মাই হার্ট এন্ড সামথিং এলজ্।’ ‘হোয়াট ইজ দ্যাট ক্যোরাল?’ আমি জানতে চাইলে সে মৃদুস্বরে বলে,‘ আমি কিন্তু সত্যিই দেখছি সে কথাগুলো..আই মিন যা বলতে চাই, কিন্তু সহজে বলতে পারি না।’

একটু পর ডিশ-ডেকচি-বর্তন-পিরিচ ধুয়েমুছে ক্যাবিনেটে তুলে দিয়ে ক্যোরাল তার ডরমিটরিতে ফিলে গেলে চা এর পিরিচের দিকে তাকিয়ে বলা তার কথাবার্তা নিয়ে আমি একটু ভাবি। খুঁজি এক টুকরা কাগজ। কিন্তু কোথাও না পেয়ে অবশেষে হিপি কবি ডিলান মাটেবেসের প্রিন্ট আউটের মার্জিনে লিখি,‘করতলে ধরো ছোট্ট সরোবর/ ছায়া পড়ে কি হৃদয়ের/ যায় শোনাÑনা বলা কথার স্বর।’ তারপর ডরমিটরিতে গিয়ে শোল্ডার ব্যাগ থেকে বের করে নিয়ে আসি একটি চিত্রিত মোমবাতি। ইজিচেয়ারে ফিরে এসে সোয়াজি কেন্ডেল কটেজ থেকে কেনা আধ ফুট লম্বা মোমবাতিটি পরখ করে দেখি। তাতে শক্ত ওয়াক্সে হরেক বর্ণে আঁকা অনেকগুলো গাছপালার সমাবেশে আস্ত একটি অরণ্যের চিত্র। বর্ণাঢ্য এ বাতিটি ছড়াচ্ছে মৃদু মৃদু সুবাস। তাতে আমার দেহমনে ছড়ায় এক ধরনের মুগ্ধতা।

বেশ রাত করে ক্যোরাল আবার লাউঞ্জে আসে। শরীর বাঁকিয়ে বুকশেল্ফের আউট ডেটেড ফ্যাশোন ম্যাগজিনগুলো ঘাঁটে। সোয়াজি বাটিকের ছাইরঙা একটি টিউনিক পরে সে এসেছে। তার চোখের নিচের দিকে হালকা ধূসর শেড। ওপরে পাপড়িতে ধাতব রঙের হাইলাইটে মেয়েটির অচঞ্চল স্বভাবে এসেছে খানিকটা স্মোকি ভাব।

একই ছাদের নিচে একত্রে কিছুদিন বাস করলে পরস্পরের অভ্যাস সম্পর্কে বেশ খানিকটা জেনে ফেলা যায়। আমি ও ক্যোরাল এ লজে বাস করছি সপ্তাহ তিনেক। সে সুবাদে আমি অবগত যে, সন্ধ্যার বেশ পরে যে রকম ট্রপিকসের বাগিচায় ফুটে সুরভিত রজনীগন্ধা, সে রকম ক্যোরালেরও খানিকটা রাত হলে সাজগোজে পুষ্পপ্রতিম হয়ে লাউঞ্জে আসার প্রবণতা আছে। না, সে কারো সাথে আউটিংয়ে বাইরে যায় না। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে জবাব দেয় পরিমিত শব্দে। লাউঞ্জের কোণে জালিতারের স্ক্রিন দেয়া স্মোকিং ডেন। ওখানে একজস্ট ফ্যান আছে বলে কাজা-কচিৎ কোন পর্যটক ডেনে বসে রোল করে সোয়াজি স্কাংক বলে বুনো ভেষজর আবগারি জয়েন্ট স্মোক করে। এছাড়া ডেন সন্ধ্যার পর থাকে মোটামুটি নিরিবিলি। ওখানে সাজগোজ করে ক্যোরাল বসে থাকে চুপচাপ। স্কাংক স্মোক করা তার স্বভাব নয়। তবে একটি মোমবাতি জ্বালিয়ে তার শিখার দিকে তাকিয়ে সে নিমগ্ন হয় ভিজ্যুয়েল ইমেজারিতে।

ভিজ্যুয়েল ইমেজারি হচ্ছে কোন কাল্পনিক দৃশ্যপটের মনছবি আঁকতে আঁকতে তাতে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত হয়ে যাওয়া। এ প্রক্রিয়ার সহায়ক হিসাবে ক্যোরালের কাছে আছে দৃশ্যকল্পের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দেয়া একটি নোটবুক। তাতে পরিষ্কারভাবে বিধৃত আছে তার কিছু বাসনা, অর্থাৎ যা সে করতে চেয়েছে, সমাজ সংসারের যে স্থরে উঠার তার আকাঙ্কা ছিলো, কিন্তু আত্মবিশ্বাসের অভাবে পূর্ণ হয়নি প্রত্যাশা। যেমন কৈশরে ক্যোরালের বাসনা হয় সেক্সপীয়রের নাটকে নায়িকা হিসাবে অভিনয় করবে। কিন্তু নানা প্রতিবন্ধকতায় তা হয়ে ওঠেনি। বর্তমানে তার নোটবুকে আছে একটি থিয়েটার দৃশ্যের খুঁটিনাটি বিবরণ। ক্যোরাল ভিজ্যুয়েল ইমেজারিতে নিমগ্ন হয়ে সে দৃশ্যপটে নিজেকে নায়িকা হিসাবে প্রতিস্থাপন করবে কল্পনায়।

ক্যোরাল কিচেন থেকে দিয়াশলাই নিয়ে স্মোকিং ডেনে গেলে আমি সোয়াজি মোমবাতি ও একটি আধপোড়া সিগার নিয়ে ওখানে যাই। ক্যোরাল একটি রকিং চেয়ারে বসে তার তলা থেকে বের করে পুড়ে ক্ষয়ে যাওয়া একটি মোমবাতি। এটি জ্বালানোর প্রধান সমস্যা হচ্ছেÑ ছিদ্র হওয়া ভাঙ্গা দেয়াল গলে ওয়াক্স ছড়িয়ে পড়বে চারদিকে। আমি পাশের ¯িপ্রং ধামসানো সোফায় বসে লাইট করি সিগার। ক্যোরাল ক্ষয়ে যাওয়া মোমটি জ্বালাবে কি না ইতস্তত করলে আমি আমি আধ ফুট লম্বা সোয়াজি কেন্ডেলটি তার সামনের টিপয়ে রাখি। ক্যোরাল,‘ওয়াও দিস ওয়ান ইজ ভেরী প্রিটি এন্ড কালারফুল’ বলে কঞ্জুসের মতো সামান্য উচ্ছাস প্রকাশ করে তা জ্বালায়। সোয়াজি কেন্ডেলটির সারফেসে বৃত্তাকারে কুঁদে গর্ত করা। সে গর্তের তলায় সলতেতে ম্যাচকাঠির আগুন দিলে আলোকিত হয়ে ওঠে বাতির গায়ে আঁকা গাছপালা। দেখতে দেখতে একদিকের চুনকাম করা দেয়ালে ছায়া পড়ে চিত্রিত অরন্যের।

ক্যোরাল মোমবাতির আলোছায়ার দিকে তাকিয়ে বলে,‘দিস কেন্ডেল ইজ সো ওয়ান্ডারফুল। মনে  হচ্ছে বনানীতে জ্বালানো হয়েছে ক্যম্পফায়ারের আগুন। এর চমৎকার আলোর দিকে তাকিয়ে কাটিয়ে দেবো আজকের সন্ধ্যা। ভিজ্যুয়েল ইমেজারিতে কনসেনট্রেশন আসবে না।’ আমি উঠে পড়তে পড়তে বলি,‘আই অ্যাম লিভিং। কথা বলে তোমার ইমেজারির ফোকাস নষ্ট করতে চাই না ক্যোরাল।’ সে মৃদু হেসে আমার হাত স্পর্শ করে বলে,‘সিট ডাউন ফর অ্যা সেকেন্ড।’ আমি অনেকদিন পর তার হাসি দেখি। কবিতার বই এ চাপা দিয়ে রাখা গোলাপফুলের চিত্রকল্প মনে আসে। মনে হয় অনেকদিন পর ক্যোরাল বইটির পৃষ্টা উল্টালো। সে মৃদুস্বরে বলে,‘কয়েকদিন ধরে ভিজ্যুয়েল ইমেজারিতে ফোকাস করতে পারছি না। মোমের আলোর দিকে তাকালে ভিডিও করার স্মৃতি মনে আসে। এ মেমরিকে অতিক্রম করে অন্য কিছু ভাবতে পারি না।’ ‘তোমার হাতে আমি ডিজিটাল ভিডিও ইক্যুইপমেন্ট দেখেছি। তুমি কি প্রফেশ্যনালি ভিডিও করতে ক্যোরাল?’ জবাবে সে বলে,‘ভিডিও ওপর তিন মাসের একটি কোর্স করেছিলাম। বিলাতের একটি নির্দ্দষ্ট লকেশনে গিয়ে কাহিনীর স্টোরি বোর্ড করে ছোট্ট একটি ভিডিও ফিল্ম তৈরী করেছিলাম। আমার ইন্সট্রাকটার চমৎকার এডিট হয়েছে বলে তারিফও করলো। কিন্তু ফাইনালের সময় বিষয়টা ম্যানেজ করতে পারলাম না।’ ‘ফাইনালে কি হয়েছিলো ক্যোরাল?’ জবাব দিতে গিয়ে গোলাপের বাসি সৌরভের মতো তার হাসিটি ফিরে আসে। সে বলে,‘ফাইনালে রিকোয়ারমেন্ট ছিলো হলরুমে শতখানেক অতিথির সামনে একটু ব্যাকগ্রাউন্ড দিয়ে ভিডিওটি প্রেজেন্ট করা। তখন সমস্যা দেখা দেয়। স্টেজে যাওয়ার আগে আমার পেনিক এটাক হয়। ওয়াশরুমে যাই। আমার দেরি হচ্ছে দেখে অন্য একজন তার ভিডিও প্রেজেন্ট করে। ইন্সট্রাকটার আমাকে শান্ত হয়ে অপেক্ষা করতে বলে। আমি ওয়াশরুমে যাওয়াতে ঘোষণা দেয়া হয় যেÑআমার প্রেজনেটেশন হবে সবার শেষে।’ ‘তারপর কি হয়েছিলো ক্যোরাল?’ ‘কি আর হবে? আমার নার্ভ বিষয়টা একেবারে নিতে পারছিলো না। তো আবার ওয়াশরুমে যাওয়ার ভাণ করে আমি হলরুম থেকে বেরিয়ে এসে ট্যাক্সি ধরি।’

সহানুভূতি দেখাতে গিয়ে আমি ক্যোরালের হাত ধরি। তখন তার কব্জিতে গাঢ় করে কাটা দাগটি দেখতে পাই। একটি নীলাভ সিন্ধুঘোটকের প্যাচিয়ে আঁকা উল্কি দিয়ে আড়াল করা বলে এতদিন তা পরিষ্কারভাবে খেয়াল করিনি। আমি ওদিকে তাকাচ্ছি দেখে সে আস্তে করে তার হাত ছাড়িয়ে নিতে নিতে বলে,‘ভিডিও প্রেজেন্ট করতে না পারার বিষয়টা আমাকে এতো ডিপ্রেসড করে তোলে যে, আমি রেজার দিয়ে কব্জি কেটে সুইসাইডের চেষ্টা করি। টোটালি স্টুপিড অব মি।’ আমি এবার জানতে চাই,‘তুমি কি এ সমস্যা অভারকাম করতে পেরেছো?’ সে জবাব দেয়,‘আমার এতদিন ধারনা ছিলো এসব অতীতের কষ্টকর অভিজ্ঞতা আমি অতিক্রম করে এসেছি। কিন্তু গেল কয়েকদিন ধরে ভিজ্যুয়েল ইমেজারি করতে বসলেই মনে চলে আসে ভিডিওর প্রসঙ্গ। এখন মনে হচ্ছে আমাকে আবার চেষ্টা করতে হবে। কোন কিছুর একটি ভিডিও সফলভাবে করতে পারলে এ স্মৃতির হাত থেকে যেমন রক্ষা পাবো, তেমনি ফিরে আসবে আত্মবিশ্বাস। তো আমি ভিডিও করা যায় এরকম চিত্ররূপময় সাবজেক্ট খুঁজছি।’

আমি তখন তাকে সোয়াজি কেন্ডেল কটেজ বলে চিত্রিত মোমবাতি তৈরির কারখানাটির কথা বলি। কারখানা না বলে স্থাপনাটিকে কুটির শিল্পের ছোট্ট কটেজ বলা চলে। সোয়াজিরা ওখানে হাত দিয়ে তৈরী করছে বর্ণাঢ্য মোম। জায়গাটিতে রঙিন নাট্যমঞ্চের মতো এক ধরনের আবেশ আছে। মাঝে মাঝে আমি ওখানকার টি-স্টলে বসে মোমবাতি তৈরীর কারিকুরি দেখি। যারা কাজ করছেন তাদের সাথেও মুখ চেনাচেনি হয়েছে। ‘তুমি চাইলে আমার সাথে ওখানে গিয়ে মোমবাতি বানানোর প্রক্রিয়ার ওপর একটি ভিডিও করতে পারো। ওয়ান্ট টু গো উইথ মি ক্যোরাল?’ সে জবাব দেয়,‘আই উইল সার্টেনলি থিংক এবাউট দিস। ভেবে দেখবো কাল তোমার সাথে কেন্ডেল ফেক্টরিতে যাওয়া যায় কি না? ভিডিও করা কোন সমস্যা নয়, আমার সে রকমের দক্ষতা আছে। আমার পেনিক এটাক হয় লোকজনের সামনে কোন কিছু উপস্থাপন করতে গেলে। এন্ড আই ডোন্ট নো হাউ অ্যাম আই গোনা সলভ্ দিস প্রবলেম?’ এ প্রসঙ্গে আমি একটি সাজেশন দেই,‘তুমি তো সফ্টওয়ার, ইন্টারন্যাট এসব ভালো বুঝ। ভিডিও প্রথমে তৈরী হোক। নাই বা প্রেজেন্ট করলে লোকজনের সামনে। একটু বিকল্পভাবে চিন্তা করে দেখো, চাইলে তুমি ভিডিওটি ইউটিউবে আপলোড করতে পারো। ব্রাউজ করতে করতে নানা দেশের মানুষ সোয়াজি কেন্ডেলের কেরেসমাতি ইন্টারন্যাটে দেখতে পাবে।’ ‘অলরাইট, বিষয়টা আমি ভেবে দেখি একটু,’ বলে ক্যোরাল মোমের শিখার দিকে তাকিয়ে নীরব হয়ে যায়। তো আমি তাকে নিরিবিলি ভিজ্যুয়েল ইমেজারীতে নিমগ্ন হওয়ার সুযোগ দেয়ার জন্য স্মোকিং ডেন থেকে বেরিয়ে আসি।

লবিতে এসে ইজিচেয়ারে বসতেই দেখি পাশের টিপয়ে পড়ে আছে হিপি কবি ডিলান মাটেবেসে’র পদ্যের প্রিন্টআউট। আমি তা তুলে নিয়ে মর্জিনে ক্যোরালের হাতে লেখা সিলভিয়া প্লাথের ‘মিরর’ কবিতার ক’টি বিচ্ছিন্ন ছত্রের দিকে তাকাই। চকিতে মনে পড়ে সিন্ধুঘোটকের উল্কি দিয়ে আড়াল করা ক্যোরালের কব্জির গাঢ় করে কাটা দাগটি। কবি সিলভিয়া প্লাথও জীবনে আত্মহননের চেষ্টা করেছেন বেশ কয়েকবার। অবশেষে তিনি সুইসাইডে সফলও হন। প্লাথের কবিতায় তবে কি ক্যোরাল দেখছে তার কষ্টের প্রতিফলন?